ফিরে দেখা

আমার স্বামী

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৯, ২০:১৯

বাংলাদেশে যে কয়জন বীরশ্রেষ্ঠ আছেন তাঁদের মধ্যে একজন আমার স্বামী মতিউর রহমান। তাঁর এই পরিচিতি মানুষের কাছে আপাতদৃষ্টিতে অসামান্য বীরত্বের এক আকস্মিক ঘটনা মনে হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে তা ছিল না। বরং এটা ছিল বহুদিনের একটা সুচিন্তিত পরিকল্পনার বহিঃপ্রকাশ।

....

...অবশেষে এল সেই দিন— ১৯শে আগস্ট। পাকিস্তানি পাইলট ফ্লাইং অফিসার রশিদ মিনহাজ একা ফ্লাই করবে আর আমার স্বামী সুযোগ বুঝে মিনহাজকে ক্লোরোফর্ম দ্বারা আচ্ছন্ন করে দুই চালক বিশিষ্ট বিমানটি হাইজ্যাক করে ভারত অভিমুখে পালাবে। সেই অনুযায়ী ১৯ তারিখ ভোরবেলা উনি অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান আর আমিও তাঁকে ভালোভাবে বিদায় দিয়ে চুপচাপ বাচ্চাদের নিয়ে বসে চিন্তায় ডুবে যাই, না জানি কী আছে ভাগ্যে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। অবাক করে দিয়ে আমার স্বামী বাড়ি এলেন। বুঝলাম তিনি সুবিধা করতে পারেননি। ঐ অবস্থায় তাঁকে সান্ত্বনা দেবারই আমার কথা, কিন্তু কেমন করে যেন বলে ফেললাম, ‘তোমাকে দেখে খুব ভালো লাগছে।’ তিনি অবাক হয়ে থমকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—‘তুমি এখনো একজন সৈনিকের বউ হওয়ার উপযুক্ত হওনি।’ লজ্জায় আমি চুপসে গেলাম, ভাবলাম, এ আমি কী করলাম! যে লোকটাকে দিনের পর দিন কিছু করতে না পারার যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখেছি তাঁকে আমি কী করে এত বড় একটা ধাক্কা দিলাম। আমি জানি না কোনো স্বামী তাঁর মৃত্যুর পূর্বেই তাঁর স্ত্রীকে সাদা শাড়ি পরিয়ে দেখে যায় কি না! কিন্তু আমার স্বামী নিজ হাতে সাদা শাড়ি কিনে এনে আমাকে সাজিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘আমি দেখলাম ভালো লাগছে, কিন্তু আমি মরে গেলে কোনোদিন পরবে না।’ সেই স্বামী যিনি নাকি ঘটনার কিছুদিন আগেও স্বপ্নে দেখেছেন যে তাঁর প্লেনের লেজটা কেউ টেনে রেখেছে, তিনি উড়ে যেতে পারছেন না। এতকিছু বুঝতে পেরেও যিনি তাঁর পরিকল্পনা থেকে এক মুহূর্তের জন্যও সরে দাঁড়াননি। তাঁকে আমি কিভাবে ঐ কথা বলে থমকে দিলাম। হয়তোবা সেই মুহূর্তে আমার সমস্ত চিন্তা-ভাবনা থেকে তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন, স্থান করে নিয়েছিল আমার দুই অবুঝ শিশুকন্যা।

মাতৃত্বই হয়েছিল আমার মুখ্য। এর আগে তুহিনকে বাড়িতে রেখে যাবার দিন যখন আমি খুব কেঁদেছিলাম তখন তিনি বলেছিলেন—‘দেশের জন্য না হয় একটা বাচ্চা দিলেই। দেশ স্বাধীন হলে বাচ্চার অভাব হবে না।’ সেই একই ভুল আবার ১৯ তারিখে করলাম, যে ভুল কোনোদিনও ভুলবার নয়।

১৯ তারিখ দিন পেরিয়ে রাত নামল। সমস্ত রাত উনি বিছনায় ছটফট করলেন। ২০শে আগস্ট ভোরবেলা কিছু বলতে গিয়েও বললেন না। কেমন যেন চুপচাপ। প্রতিদিনের মতো কাপড় পরে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। কিন্তু রোজকার মতো শুধু কেউ কাউকে খোদা হাফেজ বললাম না। মনটা অস্থির লাগছিল। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে বিমান বাহিনীর পুলিশ এসে বাড়ি ঘেরাও করল। বুঝলাম, আজ আমার স্বামীর স্বপ্ন সফল হতে যাচ্ছে। ঠান্ডা মাথায় তাঁর কথা অনুযায়ী ছবি, মানচিত্র পোড়ালাম। স্থির মনে শুধু আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করতে থাকলাম—তিনি যেন ঠিকমতো ওপারে পৌঁছাতে পারেন। এর মধ্যে শুরু হলো জেরার পালা। ২১ তারিখ বিকাল পর্যন্ত চলল এই জেরা আর অকথ্য গালাগালি। সব হজম করলাম। মাগরিবের আজানের পর আমাকে জানানো হলো তাঁর মৃত্যুর খবর। সেই তিনি ওপারে গেলেন ঠিকই তবে পাকিস্তানের নয়, পৃথিবীর। যেখান থেকে কেউ কোনোদিনও ফেরে না।      (অংশবিশেষ)

সূত্র: স্মৃতি : ১৯৭১ [প্রথম খণ্ড]/সম্পাদনা রশীদ হায়দার

(বাংলা একাডেমি, ২০১৭)