সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি

একটি বিলের অপমৃত্যু, বারবার ফিরে আসে যার প্রাসঙ্গিকতা

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৩

সংসদ সদস্যদের জন্য দেশে এখন পর্যন্ত কোনো ‘আচরণ বিধি বা নৈতিক শৃঙ্খলা’-সংক্রান্ত বিল জাতীয় সংসদে পাশ হয়নি। নানা ঘটনায় সংসদ সদস্যদের আচরণ ও নৈতিকতার বিষয়টি মাঝেমধ্যেই সামনে এলেও এ ধরনের কোনো আইন না থাকায় বিষয়টি সব সময়ই সাংবিধানিক ও আইনি বিতর্কের জালে আটকে যায়। ২০১২ সালে নবম সংসদে এ-সংক্রান্ত একটি বেসরকারি বিল সংসদে তোলা হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে সেটির ‘অপমৃত্যু’ ঘটে। তবে, চলতি ত্রয়োদশ সংসদের সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের বহিষ্কৃত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনায় এ ধরনের বিলের প্রাসঙ্গিকতা আবারও নতুন করে আলোচনায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে গত ২২ জুলাই গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। তারা বিষয়টি স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে (সিইসি) অবহিত করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। এরই মধ্যে গত রবিবার তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মরিয়মের বাবার করা মামলায় গাজী নজরুল গ্রেপ্তার হয়ে এখন রিমান্ডে।

এতকিছুর পরেও গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ এখনো বহাল থাকে কীভাবে, সে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে টিআইবি বলেছে, জনপ্রতিনিধিদের জন্য বিশেষায়িত ও বাধ্যতামূলক নৈতিক আচরণবিধি প্রণয়ন করতে হবে।

এখন প্রশ্ন, দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় এবং আত্মহত্যার প্রচোরণার মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার কারণে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না। এ নিয়ে সংবিধানে যেমন অস্পষ্টতা আছে, তেমনি অতীতেও ভিন্ন ভিন্ন নজির রয়েছে। দল থেকে বহিষ্কারের কারণে সংসদ সদস্য পদ চলে গেছে, অতীতে একাধিক ঘটনায় এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে। আবার, দল থেকে বহিষ্কার করার পরেও সংসদ সদস্য পদ যায়নি—এমন নজিরও রয়েছে দেশের সংসদীয় ইতিহাসে।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে ‘সংসদে নির্বাচিত হইবার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা’ সম্পর্কে বলা আছে। এই অনুচ্ছেদে বলা আছে—‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ-সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি— (ক) কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ ঘোষণা করে। (খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় হতে অব্যাহতি না পেয়ে থাকেন। (গ) তিনি যদি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন। (ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে।’ অর্থাৎ, নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত না হলে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ থেকে যাওয়ার একধরনের সুযোগ বহাল থাকছে।

অন্যদিকে, সংবিধানের পঞ্চম ভাগ ‘আইনসভা’র প্রথম পরিচ্ছেদ ‘সংসদ’। রাজনৈতিক দল থেকে পদত্যাগ বা দলের বিপক্ষে ভোটদানের কারণে আসন শূন্য হওয়ার বিষয়ে ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে। তবে, তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোন নির্বাচনে সংসদ সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।’

দল থেকে পদত্যাগ করলে কিংবা দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদ সদস্যপদ থাকবে না বলে সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে। কিন্তু, কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যদি দল তাকে বহিষ্কার করে, সেক্ষেত্রে কী হবে তা সংবিধানে স্পষ্ট করে উল্লেখ নেই। তবে, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোন সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে কিনা, সেসম্পর্কে কোন বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হইবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে।’

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, জামায়াত তাদের দলীয় প্যাডে ইসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল যে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ইসির এ মুহূর্তে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, বিষয়টি সংসদ সচিবালয় থেকে ইসিকে জানানোর বিধান আছে। যদি ইসি স্পিকারের কাছ থেকে চিঠি পায় তাহলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে পুলিশ কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়, তা দেখে তার সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাকে সংসদীয় কমিটিতে না রাখার জন্যও সরকারি দলের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। তার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে দুটি সংসদীয় কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু, গত ৭ সেপ্টেম্বর সরকারি প্রতিশ্রুতি কমিটিতে তার নাম রাখা হয়েছিল। পরে জামায়াতে ইসলামীর আপত্তির কারণে তার নাম বাদ দিয়ে কমিটিটি পুনর্গঠন করা হয়। সেদিন সংসদে বিষয়টি নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সেদিন সংসদে বলেছিলেন, দল থেকে বহিষ্কার করা হলে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় না। নিজ থেকে পদত্যাগ না করলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ আসে না। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেদিন কিছুটা রসিকতার সুরে বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘যদি বিরোধী দল সত্যিই চান যে তার (গাজী নজরুলের) সদস্য পদ না থাকুক, তাহলে আমি বিনা পয়সায় একটা আইনি পরামর্শ দিতে পারি। সেটা হলো এবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোটদানে বিরত ছিলেন উনি (গাজী নজরুল)। ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিরোধী দল বিষয়টি সামনে আনলে সেক্ষেত্রে সরকারি দল হিসেবে আমরা সহযোগিতা করতে পারি।’

সংসদ সদস্যদের কারো কারো বিরুদ্ধে এ ধরনের কিংবা অন্যরকম নৈতিক স্খলনের ঘটনা সামনে এলে সংসদ যেন ব্যবস্থা নিতে পারে, সে লক্ষ্যে ২০১২ সালে নবম সংসদে আওয়ামী লীগের তত্কালীন সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী সংসদ সদস্যদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটি বেসরকারি বিল সংসদে তুলেছিলেন। বিলটিতে অসংসদীয় আচরণের জন্য দুই পক্ষের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনেরও প্রস্তাব ছিল। বিলটি পরর্তীতে সংসদের বেসরকারি বিল সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতেও গিয়েছিল। তবে, তখনকার সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা দলগুলোর সাড়া না পাওয়ায় সাবের চৌধুরীর আনা সংসদ সদস্যদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ‘আচরণ বিধি বা নৈতিক শৃঙ্খলা সংক্রান্ত’ সেই বেসরকারি বিলটি সংসদে আর পাশ হয়নি।

বর্তমানে সংসদ অধিবেশন চলাকালীন সংসদ সদস্যদের আচরণ কেমন হবে, তা মূলত জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই বিধি অনুযায়ী সংসদ চলাকালীন অন্য কোনো সদস্যের বক্তব্যে বাধা সৃষ্টি করা বা হট্টগোল করা যাবে না, স্পিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করতে হবে, সংসদে কোনো সদস্য অসদাচরণ করলে স্পিকার তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। তবে, সংসদের বাইরে সদস্যদের ব্যক্তিগত বা নৈতিক স্খলনজনিত আচরণের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আচরণ বিধি এখন পর্যন্ত প্রণীত হয়নি। যদিও বিভিন্ন মহল থেকে এ দাবিটি দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চারিত হয়ে আসছে।

ইত্তেফাক/এনএন