দুঃসাহসিক সাইকেল অভিযাত্রী তাবাসসুম

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৯, ২০:৩৩

ক্লাস ফাইভে যখন পড়েন তখন তিনি প্রথম সাইকেল চালান। পরে মেয়েটির বাবাকে এক আত্মীয় সাইকেল গিফট করেন। এর কিছুদিন পর মেয়েটির বাবা বাড়ির বাইরে গেলেন। এ সুযোগে মেয়েটি সাইকেল চালানো রপ্ত করল। এরপর টুকটাক এদিক সেদিক সাইকেলে ঘুরতে যেত। তাতেই কত্ত কথা। মানুষ বলত, দেখেছ মেয়ে মানুষ আবার সাইকেলও চালায়। মেয়েটি এসব কথা একদমই পাত্তা দেয়নি। দিনের পর দিন সাইকেল নিয়ে মেতে থেকেছে। সময় পেলেই দেশের মধ্যে সাইকেল নিয়ে বেড়াতে যেত। অবশ্য লেগে থাকার সুফল তিনি পেয়েছেন। এতক্ষণ যে মেয়েটির কথা বলছিলাম তার নাম জিনিয়া তাবাসসুম। বাড়ি খুলনার দৌলতপুরে। থাকেন ঢাকার আজিমপুরে।

সম্প্রতি সে সাইকেল চালিয়ে খারদুংলা পাস জয় করেছেন। তিনিই প্রথম বাংলাদেশি মেয়ে যে কি না সফলভাবে খারদুংলা পাস করতে করলেন। জিনিয়ার আগে সাত জন খারদুংলা জয় করেছেন। ২০১৬ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে নিয়াজ মোর্শেদ খারদুংলা পাস জয় করেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮ হাজার ৩৮০ ফিট উঁচুতে এ খারদুংলা পাস। যা কি না এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের চেয়েও উঁচু। খারদুংলা জয় অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার ছিল। যাত্রা পথটা মোটেও সহজ ছিল না। তাবাসসুম জানালেন, উঁচু, নিচু পথ। প্রতিকূল পরিবেশ। ঠান্ডা লেগে গেছে, জ্বরও অনেক। তবুও সাইকেল চালানো বন্ধ করা যায়নি। লক্ষ্যে পৌঁছতে আমি ছিলাম দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কখনো মনোবল হারাইনি। তাবাসসুম মানালি থেকে সাইকেল চালিয়ে ১৮ হাজার ৩৮০ ফুট ওপরে খারদুংলা পাসে গিয়েছেন।

পৃথিবীর উচ্চতম মোটরযান চলাচলের রাস্তা এটি। এ অভিযানে তার সঙ্গী ছিলেন হেদায়েতুল হাসান ফিলিপ আর সুইস নাগরিক এরডইন। এরডইন পেশায় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। অবসরের পরে তিনি এশিয়া ট্যুরে বেরিয়েছেন। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ফুট ওপরে মানালি ছোট্ট এক পাহাড়ি শহর। শহরটি  অবকাশ যাপন, প্যারাগ্লাইডিং, রাফটিংয়ের জন্য বিখ্যাত। তাবাসসুম বললেন, যে ধারণা নিয়ে খারদুংলার পথে গিয়েছিলাম। আসলে বাস্তবে তা অনেক কঠিন ছিল। তাবাসসুম বললেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখেছি। নাক দিয়ে কখনো কখনো হালকা রক্ত পড়ছিল। উচ্চতাজনিত সমস্যা তো ছিলই। একবার একধারে আটদিন নেটওয়ার্কের বাইরে ছিলেন তাবাসসুম। যখন দেশে ফিরলেন। বাবা রাগ করে প্রায় ১৫ দিন কথা বলেনি। আমার জন্য তাকে অনেকের অনেক কথা শুনতে হয়েছে। রাগ করলেও বাবাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। বললেন তাবাসসুম।

শুধু দেশের মধ্যেও তাবাসসুম প্রচুর এলাকা সাইকেলে ঘুরেছেন। তিনটি পার্বত্য জেলা সাইকেলে চষে বেড়িয়েছেন। মাত্র ১১ দিনে বাংলাবান্ধা থেকে টেকনাফ পাড়ি দিয়েছেন। ১১ দিনে ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছেন তিনি। তখন তার সঙ্গে এক জন মেয়ে সঙ্গী ছিল। অবশ্য টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সাইকেল ট্যুরে দুজন মেয়ে সঙ্গী ছিল। একাকি এবং গ্রুপের সঙ্গে তিনি সাইক্লিং করেন। তার বেড়ানো রুটগুলোর মধ্যে আছে হালুয়াঘাট-কুয়াকাটা, ভোমরা তামাবিল, দর্শনা আখাউড়া, টেকনাফ, তেঁতুলিয়া ইত্যাদি। তিনটি ক্রস কান্ট্রি রেকর্ড আছে তার ঝুলিতে। সাইক্লিংয়ে আগ্রহীদের তাবাসসুম রুট প্ল্যান দেন। তিনি বলেন, মানুষ অনেক কথা বলবে। সব কথা শুনতে নেই। আমি চাই আমাকে দেখে মেয়েরা এগিয়ে আসুক। তবে শখ আর পেশা যেন কেউ এক সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলে সেটা অন্যদের জন্য তাবাসসুমের পরামর্শ। অসম্ভব পরিশ্রমী তাবাসসুম খারদুংলা জয় করে বাংলাদেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে এনেছেন। পাশাপাশি নারীদের জন্য অন্যতম অনুপ্রেরণার উত্স হিসেবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছেন।