জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে। তেলের দাম বাড়ার পর পণ্য পরিবহনে ট্রাকভাড়া বেড়েছে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত। এতে আমদানি করা পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে গিয়ে বাড়তি খরচের মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে ট্রাক সংকটে বন্দরে পণ্যবাহী যানবাহনের জট তৈরি হওয়ায় কমেছে আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে বেনাপোল স্থলবন্দরের বড় আঁচড়া গেট থেকে যতদূর চোখ যায়, সারি সারি কার্গো ট্রাক দেখা যায়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার থেকে খালি এসব ট্রাক এসেছে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্য নিতে।
নারায়ণগঞ্জের জান্নাত-আক্তার কার্গো সার্ভিসের ট্রাকচালক তুহিন গার্মেন্টসের কাঁচামাল নিতে মঙ্গলবার ভোরে বেনাপোলে পৌঁছান। বেলা ১১টায় ট্রাকটি লোড হওয়ার কথা থাকলেও ভাড়ার জটিলতায় তা হয়নি। বুধবার ট্রাকপ্রতি অতিরিক্ত সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে পণ্য লোড করার কথা রয়েছে।
বেনাপোলের ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীরা জানান, আগে ঢাকা রুটে ট্রাকভাড়া ছিল ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। সোমবার সকাল থেকে তা বেড়ে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা হয়েছে। চট্টগ্রাম রুটে আগে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন তা ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জ রুটেও ভাড়া বেড়েছে। আগে এসব গন্তব্যে প্রায় ২২ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও বর্তমানে তা ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।
বেনাপোলের অর্পা-অপ্সরা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির স্বত্বাধিকারী হাফিজুর রহমান বলেন, সাড়ে ১০ টনের কাভার্ড ভ্যানে বেনাপোল থেকে ঢাকার কাঁচপুরে তৈরি পোশাকপণ্য নিতে এখন ২৪ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। গত শনিবারও একই রুটে ভাড়া ছিল ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা। ১২ টনের খোলা ট্রাকের ভাড়াও ছয় থেকে সাত হাজার টাকা বেড়েছে।
তার ভাষ্য, পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়বে। কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পরিবহনে বাড়তি ব্যয় যুক্ত হলে ভোক্তা পর্যায়েও দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার আগে বেনাপোল দিয়ে প্রতিদিন সাড়ে চার শ থেকে পাঁচ শ ট্রাক আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন করলেও গত দুই দিনে তা কমে দুই শ থেকে আড়াই শ ট্রাকে নেমেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এতে বন্দরের রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, পরিবহন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ছে। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে বাণিজ্যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বেনাপোল ট্রান্সপোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পাম্পে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় সমস্যা আরও বেড়েছে। তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে টায়ার, ট্রাকের যন্ত্রাংশ ও ফেরি ভাড়াও বেড়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, অনেক পরিবহন ব্যবসায়ীর আমদানিকারকদের সঙ্গে বার্ষিক চুক্তি রয়েছে। ফলে নির্ধারিত ভাড়ায় পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে এখন তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
বেনাপোল ল্যান্ড পোর্ট ইমপোর্টার অ্যান্ড এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান জানান, প্রতিদিন বেনাপোল দিয়ে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি করে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর পণ্য পরিবহনে ট্রাকভাড়া পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ সেপ্টেম্বর বেনাপোলে ২৪৯ ট্রাক পণ্য আমদানি ও ১০৬ ট্রাক রপ্তানি হয়। ২০ সেপ্টেম্বর আমদানি হয় ৩১২ ট্রাক এবং রপ্তানি ৩৫ ট্রাক। ২১ সেপ্টেম্বর আমদানি কমে ২৪৬ ট্রাকে এবং রপ্তানি নেমে আসে ১১ ট্রাকে। ২২ সেপ্টেম্বর আমদানি হয়েছে ১১৫ ট্রাক এবং রপ্তানি ৮০ ট্রাক।
বন্দরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক আমদানিকারক পণ্য আনলেও ট্রাকের সংকটে তা শেডে আটকে থাকছে। এতে বন্দরের ভেতরে কিছুটা ট্রাকজট তৈরি হয়েছে।
এদিকে জ্বালানি তেল পাচার রোধে যশোর সীমান্তে টহল, তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বেনাপোল স্থলবন্দরসহ শার্শা ও চৌগাছা সীমান্তে জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন যশোর ৪৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম মোহাম্মদ সাইফুল আলম খান।

