মিরপুরে মধ্যরাতে হামলা-লুটপাট চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো এনজিওর ক্লিনিক, মামলা দায়ের

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৩৯

রাজধানীর মিরপুরে স্বল্পমূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তবে এ ঘটনার পর ক্লিনিকটির আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাতে সংঘটিত এ ঘটনায় শুক্রবার বাদী হয়ে শাহ আলী থানায় লিখিত অভিযোগ করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার। পাশাপাশি একজনের নাম উল্লেখ করে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে শাহ আলী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

শাহ আলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জাহাঙ্গীর আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

ওসি জানান, পুলিশ ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে ২টার মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত ক্লিনিকটিতে এ তাণ্ডব চালানো হয়।

এ বিষয়ে ডা. নাসরিন আখতার জানান, রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ইপিআই টিকা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবাদানকারী অলাভজনক এনজিও। ১৯৭৬ সালে চালু হওয়া এই আউটডোর ক্লিনিকটি থেকে বিনামূল্যে সরকারি ইপিআই টিকাসহ দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছিল।

ঘটনার বিবরণ দিয়ে অভিযোগ করে তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে ২০০ থেকে ২৫০ জন ব্যক্তি মুখ লুকিয়ে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড-এর ব্যানারে এসে ক্লিনিকটিতে ভাঙচুর চালায়। হামলার সময় তারা ক্লিনিকের নিরাপত্তা কর্মীদের জিম্মি করে ফেলে। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি এনে একটি পাকা ভবন ও তিনটি সেমি-পাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনাটি পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেয়। ধ্বংসস্তূপে তারা সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেডের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়ে চলে যায়।

ভাঙচুরের পাশাপাশি ক্লিনিকে রক্ষিত মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও নগদ টাকা লুট করা হয়েছে উল্লেখ করে ডা. নাসরিন আখতার বলেন, দুষ্কৃতকারীরা ৫ লাখ টাকা মূল্যের ওষুধ ও ভ্যাকসিন, নগদ আনুমানিক ১১ লাখ ৪০ হাজার টাকা, ৪৫ লাখ টাকার আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ৩টি ফ্রিজ, ৩টি এসি, সিসিটিভি ক্যামেরা, ৩টি স্টিলের আলমারি, ৫টি ফাইল কেবিনেট, ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও রিএজেন্ট, ২টি টিভি, ২টি কম্পিউটার, ২টি ল্যাপটপ, ২টি প্রিন্টারসহ সব আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে গেছে। এই ভাঙচুর ও লুটপাটে প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

জমি সংক্রান্ত কোনো বিরোধ বা নোটিশের বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করেন, পুলিশ বা কোনো সরকারি দপ্তর থেকে তারা আগে থেকে কোনো উচ্ছেদ বা সতর্কীকরণ নোটিশ পাননি। হঠাৎ গভীর রাতে ট্রাক ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে এসে এই উচ্ছেদ চালানো হয়।

এ ঘটনায় ডা. নাসরিন বাদী হয়ে মো. হানিফ মিয়া (৫০) নামের এক ব্যক্তির নাম উল্লেখসহ ২০০–২৫০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাহ আলী থানায় মামলা দায়ের করেছেন।

অপরদিকে, জমিটির মালিকানা নিয়ে নিজেদের পক্ষে অবস্থান তুলে ধরেছে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড। জমিটি ২০০৬ সালে তাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এবং ২০২১ সালে ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটি (জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ) থেকে জমিটি তাদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয় বলে দাবি করে তারা।

সমিতির পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়, এনজিও ক্লিনিকটি উচ্ছেদের জন্য ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটি থেকে চিঠিও ইস্যু করা হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও কমিশনার কাসেম মোল্লাসহ অন্যান্য নেতাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এতদিন জমিটি উদ্ধার বা উচ্ছেদ পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি।

গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও উচ্ছেদ বাধাগ্রস্তকারীদের স্থানত্যাগের পর জমিটি পরিত্যক্ত ছিল। বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ দিন ধরে সমিতির সদস্যরা নিজেদের জমি ভোগ করতে পারছিলেন না বলেও উল্লেখ করেন তারা।

এদিকে, হামলা ও লুটপাটের সময় থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ক্লিনিক সংশ্লিষ্টরা। ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও কেন হামলাকারীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
  

 

ইত্তেফাক/এনটিএম