স্মরণ

শহিদ এএসআই সিদ্দিকুর রহমান

আপডেট : ২০ আগস্ট ২০১৯, ২১:১৬

বঙ্গবন্ধুর আদর্শে লালিত বঙ্গবন্ধুর খুব কাছে থেকে তার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন এএসআই সিদ্দিকুর রহমান, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, বাংলাদেশ পুলিশ। কিন্তু এখনো অনেকেই জানেন না সিদ্দিকুর রহমানের কথা। সাহসী এই যুবক ছিলেন বঙ্গবন্ধুপ্রেমিক। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিনিরাপত্তার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত ছিলেন তাদের মধ্যে একজন হলেন এএসআই সিদ্দিকুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জীবনে এক কলঙ্কিত অধ্যায়। জাতির পিতাকে নির্মমভাবে প্রাণ দিতে হয় ঘাতকের হাতে। সেই রাতে পৃথিবীর ঘৃণ্যতম হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে। কতিপয় বিপথগামী কুচক্রী সেনাসদস্য সেদিন অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কেড়ে নিয়েছিল জাতির পিতার প্রাণ। তখন সাদা পোশাকের এক সাহসী তরুণ একাই সার্ভিস রিভলবার নিয়ে রুখে দাঁড়িয়েছিল পথভ্রষ্ট সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে।

১৫ আগস্টের রাত পেরিয়ে ভোর ৫টা ৪০ মিনিট। অন্যান্য দিনের মতো স্বাভাবিক নিয়মে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির নিরাপত্তারক্ষীরা বিউগল বাজিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করছে। ঠিক তখনই আচমকা ঘাতকের দল মুহুর্মুহু গুলিতে চারদিক অন্ধকার করে ফেলে। প্রথমে তারা প্রধান ফটকে প্রবল বাধা পেয়েছিল। অনবরত প্রবল গুলিবর্ষণে যেন মাটি পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। সামান্য অস্ত্র সম্বল করেও পিছ-পা হননি বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কয়েকজন অকুতোভয় সৈনিক। প্রধান ফটকে অবস্থান নিয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুললেন তারা। মৃত্যুকে পরোয়া করেননি, আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন প্রাণপ্রিয় নেতা, দুঃখী মানুষের রাখাল রাজা বঙ্গবন্ধুর প্রাণ বাঁচাতে। সে মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার জন্য লড়াই করেছেন দুই বীর, পুলিশের  বিশেষ শাখার (এসবি) এএসআই সিদ্দিকুর রহমান ও সিপাহি শামসুল হক।

নাটকীয়ভাবে ঘটতে থাকে নারকীয় ঘটনা, যা ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। ক্যাপ্টেন বজলুল হুদা অস্ত্রের মুখে সবাইকে বাইরে গিয়ে দাঁড়ানোর আদেশ দেয়। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির গেটের সামনে মুহিতুল, নুরুল ইসলাম, আব্দুল মতিন, পুলিশের বিশেষ শাখার এএসআই সিদ্দিকুর রহমানসহ অন্যদের লাইন ধরে দাঁড় করানো হয়। তখন সিদ্দিকুর মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও লড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু খুনিদের ব্রাশফায়ারে প্রাণ দেন সিদ্দিকুর রহমান। পিস্তলটি তখনো তার হাতে ধরা।

ইতিহাস কতটা নির্মম! ইতিহাসে এই বীরের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না কোথাও। খুঁজে পাওয়া যায়নি তার একটি ছবিও। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু মেলেনি মুক্তিযোদ্ধা সনদ। মৃত্যুর আগে স্ত্রী ফিরোজা বেগম ও দুই সন্তানের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারেননি এএসআই সিদ্দিকুর রহমান। খুব অল্প বয়সেই বাবাকে হারিয়ে কঠিন জীবনযুদ্ধে নামতে হয় সিদ্দিকুর রহমানের দুই ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান ও মাহফজুর রহমানকে। স্বামীর মৃত্যুর ১৭ বছর পর হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ফিরোজা বেগম।

দীর্ঘ ৩৭ বছর পর ২০১২ সালে পুলিশ বাহিনীকে যখন স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয় তখন একই সঙ্গে এএসআই সিদ্দিকুর রহমানকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (BPM) সাহসিকতা (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। সনদ প্রদানের ঐ সময় বলা হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সময় তিন জন বীর প্রতিরোধে এগিয়ে যান এবং শাহাদাতবরণ করেন। অকুতোভয় এই তিন বীর হলেন কর্নেল জামিল, এএসআই সিদ্দিকুর রহমান ও সিপাহি শামসুল হক।

n লেখক : অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন)