১৯ বছরেও চালু হয়নি ৫ কোটির প্রকল্প, রামগড়ে আবাসিক অনাথ স্কুল যেন ‘ভূতুরেবাড়ি’

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৯

চারিদিকে বন-জঙ্গল। টিনশেডের আধাপাকা ঘরগুলোর টিনের ছাউনি নেই। নেই দরজা-জানালা। ছাদ করা বিশালায়তনের দুটি ভবনেরও একই হাল। কাঠের দরজা, জানালা ঘুণে খেয়ে ভেঙে গেছে। ভবনের ভেতরের বিভিন্ন কক্ষে সাজিয়ে রাখা স্কুল বেঞ্চ, হোস্টেল কক্ষে পড়ার বক্স টেবিল ও চেয়ার, স্টিলের তৈরি দোতলা খাট ইত্যাদি আসবাবপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। মাকড়সা আর নানান পোকা-মাকড়ের বাসা বেঁধেছে প্রতিটি কক্ষ। দেওয়ালগুলো জঙ্গলি লতায় ঢাকা। পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। দিনের বেলায়ও অন্ধকার পরিবেশ। সবকিছু মিলিয়ে যেন একটি ভূতুরেবাড়ি। কিন্তু বাস্তবে এটি খাগড়াছড়ির রামগড় পৌরসভার তৈছালাপাড়া এলাকায় অবস্থিত এতিম-অনাথদের জন্য সরকারি টাকায় নির্মিত একটি পরিত্যক্ত আবাসিক স্কুল।

স্থানীয় এতিম ও অনাথ বালক বালিকাদের ফ্রি লেখাপড়ার সুযোগ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যেই দীর্ঘ প্রায় ১৯ বছর  আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল এ আবাসিক স্কুলটি। ক্লাস রুম, বেঞ্চ ব্ল‍্যাকবোর্ড ছাড়াও বালক ও বালিকাদের জন্য আলাদা আলাদা দুইটি বিশাল সুদৃশ্য হোস্টেল ভবন, যেখানে রয়েছে ৫টি করে হল রুম, একটি ডাইনিং রুম, অফিস রুম, কেয়ারটেকার রুম ও আধুনিক মানের ওয়াশ রুম।

হোস্টেল রুমে স্টিলের তৈরি দোতলা খাট, লেপ, তোশক, বেড সিট, বালিশ, মশারি, রিডিং বক্স টেবিল, চেয়ার। ডাইনিং রুমের যাবতীয় ফার্নিচার, ক্রোকারিজ সামগ্রী, কিচেনের হাঁড়ি-পাতিল প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্রই কেনা হয়। প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও কর্মচারীর জন্য পৃথক পৃথক ডরমেটরিও নির্মাণ করা হয়। স্থাপন করা হয় বৈদ্যুতিক ও পানি সাপ্লাই ব্যবস্থা। এখন বিদ্যালয়টির অবকাঠামোসহ সব সম্পদই ধ্বংসপ্রায়। প্রায় ১২ একরের জায়গায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি পাকা সীমানা প্রাচীরে সংরক্ষিত।

পাচউবো সূত্রে জানা যায়, ২০০৫-০৬ সালে বিএনপি সরকারের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ির এমপি ওয়াদুদ ভূইয়া রামগড়ের এতিম-অনাথ বালক বালিকাদের জন্য আবাসিক স্কুলটি প্রকল্পভুক্ত করেন। ঐ সময় রাঙ্গামাটির রাজস্থলি ও বান্দরবানের রুমায়ও একই প্রকল্প নেওয়া হয়। তিনটি স্কুলের জন্য ৫ কোটি টাকা করে মোট ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ঠিকাদারের মাধ্যমে তিনটি স্কুলের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণসহ অন্যান্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পর রাজস্থলি ও রুমায় স্কুল দুটি চালু হলেও রামগড়ের স্কুলটি চালু করা করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে রামগড়ের স্কুলের জন্য মাস্টাররোলে ৪ জন গার্ড, ২ জন টেবিল বয়, ২ জন আয়া, পিয়ন ও এক জন ঝাড়ুদার নিয়োগ এবং ২০০৮ সালে ৬০ জন এতিম, অনাথ বালক ও ৬০ জন বালিকা ভর্তির প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি সরকারের পতনের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় এ স্কুলটি চালু করা যায়নি।

গত শুক্রবার সরেজমিনে পরিদর্শন করে দেখা গেছে, কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও গাফিলতিতে সরকারের কোটি কোটি টাকা এ সম্পদ অনাদরে-অবহেলায় পরিত্যক্ত থেকে এখন ধ্বংসের শেষপ্রান্তে। ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য ক্রয় করা লেপ, তোশক, বালিশ, বিছানার চাদর, মশারি, ডাইনিং ও কিনেচের তৈজসপত্র, বিভিন্ন ভবনের বৈদ্যুতিক পাখা, লাইট, পানির ট্যাংকসহ মূল্যবান বিভিন্ন সামগ্রী রুমে-রুমে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এখন এসব মূল্যবান জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। আবার অনেক কিছু চুরিও হয়ে গেছে। অহিদুর রহমান নামে একজন কেয়ারটেকার নিয়োজিত থাকলেও তিনি নিধিরাম সর্দারের মত। নিয়মিত বেতনও পান না বলে জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের খাগড়াছড়ির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না শর্তে বলেন, ‘স্কুলটির ব্যাপারে গত ১৯ বছর ধরেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। কিন্তু চালুর ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা আসেনি।’

এদিকে, গত শুক্রবার খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটর সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়া ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা পরিত্যক্ত আবাসিক অনাথ স্কুলটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তারা পুরো এলাকা ঘুরে দেখেন। এসময় পাচউবোর ভাইস চেয়ারম্যান (যুগ্মসচিব) শেখ ছালেহ্ আহাম্মদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শন শেষে খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটর সভাপতি ওয়াদুদ ভুইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘পার্বত্য এলাকার পাহাড়ি-বাঙালি এতিম-অনাথ শিশুদের বিনা মূল্যে শিক্ষার সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে রামগড়ে এতিম-অনাথ বালক বালিকার আবাসিক স্কুলটি স্থাপন করা হয় আমার উদ্যোগে। অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষক নিয়োগ এমনকি ছাত্রছাত্রী ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও বিএনপি সরকার পরিবর্তনের পর স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে সরকারের অনেক অর্থ অপচয় হয়। বর্তমানে স্কুলটির ভবন, আসবাবপত্র, ছাত্রদের আবাসিক বেড বিচানাসহ যাবতীয় সরঞ্জামাদি নষ্ট হয়ে গেছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘রামগড়ে আমি স্থাপন করেছিলাম এখানকার পাহাড়ি-বাঙালি সকল সম্প্রদায়ের এতিম-অনাথ ছাত্রছাত্রীদের জন্য। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে স্কুলটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।’

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা বলেন, ‘আমি স্কুলটি সরেজমিনে পরিদর্শন করে অবাক হলাম। এত সুন্দর একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হলো না। সরকারের কোটি কোটি টাকার এ সম্পদ আজ ধ্বংস করা হলো। কেন এ রকম করা হেলা আমি জানি না।’

পাচউবো চেয়ারম্যান বলেন, স্কুলটি চালু করার ব্যাপারে আমরা নতুন করে উদ্যোগ নেব।

ইত্তেফাক/এসএএস