প্রাথমিকে চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগবঞ্চিতদের শাহবাগে অবস্থান

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩:৪৭

কঠোর পরিশ্রম আর মেধার লড়াই শেষে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তারা। দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার স্বপ্ন থাকলেও শেষ মুহূর্তে পুলিশ ভেরিফিকেশনের মারপ্যাঁচে ছিটকে পড়তে হয়েছে হাজারো যোগ্য প্রার্থীকে। অধিকারবঞ্চিত এই চাকরিপ্রার্থীরা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে রাজপথে নেমেছেন। নিয়োগপত্র প্রদানের দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছেন তারা।

রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে দুই শতাধিক প্রার্থী অংশ নেন। এর আগে সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন চাকরিপ্রার্থীরা। পরে সেখান থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনের সড়ক ও চত্বরে অবস্থান নেন তারা।

আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য, অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বেন না। আন্দোলনকারী আল মামুন বলেন, ‘বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা অধিকারবঞ্চিত হয়েছি। অনেক কষ্ট ও সংগ্রাম করে আমরা এত দূর এসেছি। সরকারের কাছে আমাদের বিনীত অনুরোধ, আমাদের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হোক।’

কোলে ১৫ মাস বয়সী দুধের সন্তানকে নিয়ে সুদূর রাজশাহী থেকে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন মোসা. খাদিজা বানু। তিনি নিজের করুণ পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমার ১৫ মাস বয়সী সন্তান রয়েছে। তবুও দাবি আদায়ের আশায় এত দূর থেকে এসেছি। দেয়ালে আমাদের পিঠ ঠেকে গেছে। রাতে কোথায় থাকব জানি না। প্রয়োজনে রাজপথে থাকার প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি।’

চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়া প্রার্থীদের অন্যতম তানভীর রহমান বাপ্পারাজ সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ‘সরকার আমাদের বাদ দেওয়ার যে কারণগুলো জানিয়েছে, সেই কারণ দেখিয়ে আমাদের বাদ দেওয়ার অধিকার কি সরকার রাখে? আমরা এক সরকারের আমলে পরীক্ষা দিয়েছি এবং বর্তমান সরকারের আমলে নিয়োগ হচ্ছে বলেই কি কেবল রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে আমাদের বাদ দেওয়া হয়েছে? এই প্রশ্নটাই সরকারের কাছে রেখে গেলাম।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা এখানে এসেছি, আমরা কোনো মারামারি করতে আসিনি, কোনো বিশৃঙ্খলা করতেও আসিনি। আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য এসেছি। চূড়ান্ত নিয়োগপত্র হাতে না নিয়ে আমরা ঢাকা ছাড়ব না।’

এদিকে অবস্থান কর্মসূচিতে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনরত শিক্ষকদের প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) পক্ষ থেকে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের। তিনি বলেন, ‘এখানে যারা উপস্থিত আছেন, তাঁদের সবাই উচ্চশিক্ষিত ও যোগ্য। তাঁরা কেউ কোনো ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে যুক্ত নন, দেশবিরোধী কোনো কার্যকলাপেও যুক্ত নন কিংবা কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তারপরও ভেরিফিকেশন নামক এক প্রহসনের মধ্য দিয়ে তাঁদের অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটা সুস্পষ্ট জুলুম।’

ডাকসুর এই প্রতিনিধি আরও বলেন, ‘এখানে কেউ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আসেননি। প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে জুলুমের শিকার হয়েছেন এবং পরীক্ষার মাধ্যমে নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁদের এখন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার কথা, রাজপথে নেমে আন্দোলন করার কথা নয়। সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যাঁদের সঙ্গে এমন সুস্পষ্ট অন্যায় করা হচ্ছে, দ্রুত সেই অন্যায়ের কার্যকর প্রতিকার করুন।’

আন্দোলনকারী প্রার্থীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫–এর ভেরিফিকেশনে ৬১ জেলায় মোট ২ হাজার ৩৮৫ জন চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীকে আকস্মিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে সারা দেশে চূড়ান্ত প্রার্থীদের হাতে আনুষ্ঠানিক নিয়োগপত্র তুলে দেওয়া শুরু হলেও শত শত প্রার্থী তা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার বিষয়টি মানবিক ও ন্যায়সংগতভাবে পুনর্বিবেচনা করে নিয়োগের চূড়ান্ত সুযোগ না দেওয়া পর্যন্ত শাহবাগে তাদের এই শান্তিপূর্ণ অবস্থান অব্যাহত থাকবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা।

ইত্তেফাক/এনএন