মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার বড় একটি অংশ পদ্মা নদীর চরাঞ্চল ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা। বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকার অনেক অংশে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে; তখন নৌযানই হয়ে ওঠে একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। এমন ভৌগোলিক বাস্তবতায় হরিরামপুরকে সরকারি গেজেটে দুর্গম উপজেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্গম ভাতা দেওয়ার দাবি উঠেছে।
ইতোমধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের আওতায় হরিরামপুরকে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গেজেটভুক্ত দুর্গম এলাকার তালিকায় উপজেলার নাম না থাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমের জন্য দেশের ২৩ জেলার ৭৫টি উপজেলাকে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচনার উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন সচিবালয়। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী (নি:স:-২) স্বাক্ষরিত একটি চিঠি ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। চিঠির স্মারক নম্বর ১৭.০০.০০০০.০২৬.৩২.০০১.২৫.১৫১।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে দুর্গম এলাকা হিসেবে বিবেচিত হলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট গেজেটে হরিরামপুরকে দুর্গম উপজেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে একই ধরনের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তারা দুর্গম এলাকার জন্য প্রযোজ্য ভাতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরকারি নথি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্টরা জানান, মানিকগঞ্জের দৌলতপুর ও হরিরামপুরকে গ-শ্রেণির উপজেলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দৌলতপুরকে চর উপজেলা হিসেবে দুর্গম এলাকার তালিকায় রাখা হলেও হরিরামপুরকে একইভাবে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। তাদের ভাষ্য, দৌলতপুরের মতো হরিরামপুরেরও বড় একটি অংশ চরাঞ্চল। উপজেলার আজিমনগর, লেছরাগঞ্জ ও সুতালড়ি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মা নদী ও চরাঞ্চলবেষ্টিত।
দুর্গম উপজেলা হিসেবে গেজেটভুক্ত করার দাবিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর হরিরামপুরের চরাঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন দিয়েছেন। আবেদনের অনুলিপি দেওয়া হয়েছে মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য, হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও হরিরামপুর উপজেলা প্রেসক্লাবে।
আবেদনে বলা হয়েছে, উপজেলার ভৌগোলিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, নদীভাঙন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনায় হরিরামপুরকে দুর্গম উপজেলা হিসেবে সরকারি গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুর্গম এলাকার জন্য প্রযোজ্য ২০ শতাংশ ভাতা দেওয়ার দাবিও জানিয়েছেন। তবে এই ভাতা চালুর বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি নীতিমালা ও কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল।
হরিরামপুরের চরাঞ্চলে দুর্গমতার প্রভাব শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থায়ও পড়ছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত যাতায়াত ও পদায়নে সমস্যার পাশাপাশি নদীভাঙনে বিদ্যালয়ের অবস্থান পরিবর্তন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং বর্ষায় নৌপথের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চরাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও নদীনির্ভর জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। ফলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি এবং অভিভাবকদের শিক্ষাবিষয়ক সম্পৃক্ততা অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হয়। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের দ্রুত উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নেওয়াও বর্ষায় কঠিন হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটসহ আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধাও চরাঞ্চলের সব এলাকায় সমানভাবে পৌঁছায়নি।
এ কারণে সরকারি তথ্য সংগ্রহ, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, বিভিন্ন জরিপ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়তি ভোগান্তি পোহাতে হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন কার্যক্রমে দুর্গম এলাকার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার নজির রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সময় দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের অতিরিক্ত ভাতা দেওয়ার সুযোগ অতীতেও ছিল। পার্বত্য, হাওর, দ্বীপ ও সমতল ভূমির দুর্গম এলাকাগুলোকে যোগাযোগব্যবস্থা, ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও দুর্গমতার মাত্রা বিবেচনায় ভবিষ্যতে শ্রেণিভিত্তিকভাবে তালিকাভুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও জানানো হয়েছে।
হরিরামপুরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ বলছেন, দুর্গম বা দূরবর্তী এলাকায় পদায়ন হলে অনেকের সেখানে কাজ করতে অনাগ্রহ তৈরি হয়। কেউ বদলির আদেশ পাওয়ার পর যোগদানে বিলম্ব করেন, আবার কেউ যোগ দেওয়ার পর দ্রুত সুবিধাজনক কর্মস্থলে বদলির চেষ্টা করেন। তাদের মতে, দুর্গম এলাকায় কর্মরতদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে এসব এলাকায় কাজের পরিবেশ উন্নত হতে পারে। তবে বদলি বা পদায়ন নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনাগ্রহের এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, ‘চর ভাতার বিষয়ে ডিসি স্যার বরাবর একটা আবেদন দেওয়া হয়েছে, এটার বিষয়ে লেখাও হয়েছে। মিনিস্ট্রি থেকে আমরা এখনো কোনো ফিডব্যাক পাইনি। ডিসি স্যারকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে।’
