২৪ বছরের উপার্জনের ৯৯ শতাংশই হারিয়ে ফেলেছেন কিংবদন্তি রবার্তো কার্লোস

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:৩৪

বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই শান্তিতে ঘুমাতে গিয়েছিলেন তিনি। ঘুণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি, শুক্রবার সকালে ঘুম ভাঙলেই জীবনের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই হাতে আসে একগাদা অচেনা নথিপত্র, যেগুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে আগে কখনো শোনেনইনি। সেই কাগজগুলোতে চোখ বুলিয়ে মুহূর্তেই পায়ের তলার মাটি সরে যায় তার—বুঝতে পারেন, ফুটবল খেলে দীর্ঘ ২৪ বছরে রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে যা কিছু অর্জন করেছিলেন, তার প্রায় সবটাই বেদখল হয়ে গেছে।

সম্প্রতি পর্তুগালে আয়োজিত এক ফুটবল সম্মেলনে ক্যারিয়ারের সব সম্পদ নাটকীয়ভাবে হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার এই করুণ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেছেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি লেফটব্যাক রবার্তো কার্লোস। ৫৩ বছর বয়সী এই তারকা ডিফেন্ডার জানান, ধূর্ত এজেন্ট এবং পারিবারিক বিরোধের জেরে ফুটবল ক্যারিয়ারের উপার্জনের ৯৯ শতাংশ সম্পদই এখন তার হাতছাড়া।

খেলোয়াড়ি জীবনে কার্লোসের আনুমানিক মোট উপার্জন ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু সেই বিপুল ঐশ্বর্যের প্রায় কিছুই আজ আর অবশিষ্ট নেই তার কাছে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘এমন কিছু মানুষের কারণে আমি সমস্যায় পড়েছিলাম, যারা আমাকে সম্পূর্ণ শূন্য করে রেখে গেছে। এজেন্ট এবং পারিবারিক সমস্যার কারণে ফুটবল খেলে যা কিছু আয় করেছিলাম, তার ৯৯ শতাংশই হারিয়েছি।’

অর্থ লোপাটের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ কিংবা সংশ্লিষ্ট সেই এজেন্টের নাম প্রকাশ করেননি কার্লোস। এর সঙ্গে কোনো গুরুতর পারিবারিক সমস্যার যোগসূত্র রয়েছে বলে জানালেও বিষয়টি তিনি স্পষ্ট করেননি।

ফুটবল মাঠের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবন ও একাধিক বিয়ে নিয়েও ক্যারিয়ারজুড়ে তুমুল আলোচনায় ছিলেন ব্রাজিলের এই বিশ্বকাপজয়ী তারকা। সম্প্রতি মরক্কোর ব্যবসায়ী সোহাইলা তাহিরির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন তিনি, যা তার তৃতীয় আনুষ্ঠানিক বিয়ে।

এর আগে ২০০৩ সালে প্রথম স্ত্রী আলেকজান্দ্রা পিনহেইরোর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটে, যে সংসারে তার তিন সন্তান রয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের জুনে মারিয়ানা লুকনকে বিয়ে করেন কার্লোস এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের দাম্পত্যের পর ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তাদেরও বিচ্ছেদ হয়। দ্বিতীয় সংসারে রয়েছে দুটি কন্যাসন্তান। সব মিলিয়ে সাতজন নারীর গর্ভে রবার্তো কার্লোসের সন্তানের সংখ্যা ১১।

সর্বস্ব হারানোর সেই ভয়াবহ মুহূর্তের বর্ণনা দিতে গিয়ে ব্যথিত কার্লোস বলেন, ‘আমার খুব গুরুতর একটি পারিবারিক সমস্যা ছিল। বৃহস্পতিবার রাত ১২টায় ঘুমাতে গিয়েছিলাম। শুক্রবার একগাদা কাগজপত্র পেলাম, যেগুলো সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। তখনই বুঝতে পারলাম, আমি আমার পুরো ইতিহাস হারিয়ে ফেলেছি।’

মাঠের সাফল্যের নিরিখে তার সেই ‘ইতিহাস’ ছিল রূপকথার মতো। ব্রাজিলের জার্সিতে ২০০২ বিশ্বকাপ জয় ছাড়াও রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তিনটি উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ও চারটি লা লিগা শিরোপা জিতেছেন তিনি। তার বাঁ পায়ের তীব্র গতির শট, বাঁকানো ফ্রি-কিক ও ক্ষিপ্র গতি এখনো ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলিন।

তবে মাঠের সেই অর্জন জীবনের বাইরের কঠিন খেলায় তাকে আর্থিক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। তাই নিজের এই তিক্ত অভিজ্ঞতাকে তরুণ প্রজন্মের ফুটবলারদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে উপস্থাপন করতে চান তিনি। কার্লোস বলেন, ‘আমি ভুল করেছি। তাই তরুণ খেলোয়াড়দের বলব, তারা যেন একই ভুল না করে। আমি সব সময় খেলার পর কী করব তা নিয়ে ভাবতাম। একজন খেলোয়াড় হিসেবে নিজের সুনাম ও ইতিহাস তৈরি করা এবং নিজের ভাবমূর্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি।’

তিনি জানান, ফুটবলকে বিদায় জানানোর আগেই তিনি ভবিষ্যতের প্রস্তুতি হিসেবে স্পোর্টিং ডিরেক্টরের লাইসেন্স নিয়েছিলেন এবং একাধিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ শুরু করেছিলেন। বুটজোড়া তুলে রাখার পরও রিয়াল মাদ্রিদের শুভেচ্ছাদূত ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে যুক্ত থেকে নতুন করে পথ চলছেন এই কিংবদন্তি।

ইত্তেফাক/এনএন