রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং ইসিবি চত্বর এলাকায় জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও-কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা ও ভাঙচুরসহ গত কয়েকদিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা-ভাঙচুর-অবৈধ দখলের ঘটনায় বিব্রত সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন প্রতলিত রাজনীতি ও সরকার পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন, তখন এসব ঘটনায় নিজ দলের নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার ঘটনায় সরকারের পাশাপাশি বিএনপিও বড় ধরনের অস্বস্তিতে পড়েছে।
বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক ও পেশিশক্তির প্রভাব খাটিয়ে ভূমি ও বাড়ি দখল, খাসজমি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজির এসব ঘটনায় দেশের বিশিষ্ট নাগরিক সমাজ গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ব্যাপক সমালোচনা চলছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ-ভীতি ছড়িয়েছে এসব ঘটনা। প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা হয়েছে। অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। অভিযুক্ত অন্যদেরও ধরতে পুলিশ তত্পর।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা ইত্তেফাককে জানান, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশে প্রতিটি ঘটনায় দলের কারা কারা জড়িত, কাদের ইন্ধন রয়েছে- এসব খতিয়ে দেখতে বিএনপি অভ্যন্তরীণভাবে তদন্ত করছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপও নেওয়া হবে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে। এছাড়া, এসব কর্মকা্ল বন্ধে প্রয়োজনে দেশব্যাপী অভিযান পরিচালনার কথাও চিন্তা করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে বলেছেন, দেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অবৈধ দখলের ঘটনায় সরকার দুঃখিত এবং অবশ্যই বিব্রত। প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের ভিত্তিতে জড়িতদের কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনা হবে এবং কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
বিশেষ করে, ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার’ নামের প্রাচীন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে মধ্যরাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা সরকারকে বেশি বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে। এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের জড়িত থাকার অভিযোগ তদন্ত করছে পুলিশ। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও শ্রমমন্ত্রীসহ বিএনপির স্থানীয় শীর্ষ নেতারা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন তারা। প্রশাসনের সহযোগিতায় সেখানে টিকা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়েছে। এছাড়া, স্থাপনা মেরামতের কাজও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
ঢাকার ইসিবি চত্বরে কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’-তে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনাটিকেও গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে সরকার। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে। মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকা এবং আদাবরের শেখেরটেকে জমি ও বাড়ি দখলকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায়ও ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় হামলাকারীদের জড়ো করা, দেশীয় অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ এবং এক্সক্যাভেটর আনার সঙ্গে যুক্ত বিএনপির স্থানীয় কয়েকজনের ব্যাপারে ইতোমধ্যে তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামের সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেয় হামলাকারীরা। এই সমিতির কার্যক্রমের সঙ্গেও স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে। তারা বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। যদিও শুরু থেকেই ফেরদৌসী আহমেদ এই হামলার ঘটনায় জড়িত নন বলে দাবি করেছেন।
চারদিন ধরে দেশব্যাপী আলোচিত এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১০ জনের বেশি ব্যক্তিতে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বে অবহেলার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় রবিবার শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার আগে জড়িতদের অনেকে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। পরে তারা সেখান থেকে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা করতে যান। হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, আবুল কালাম এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ আরো কয়েকজন একটি সাদা মাইক্রোবাসে ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘুরে নির্দেশনা দেন বলেও প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে। জানা গেছে, ঘটনাস্থলে ভাঙচুর ও লুটপাটের নেতৃত্ব দেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ওরফে নাডা আওলাদ এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াস। ভাঙচুরে ব্যবহূত এক্সক্যাভেটর জোগাড় করেন শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মারুফ। হানিফ মিয়া, আবুল কালাম ও মোস্তফা জগলুল পাশা তিনজনই সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা ও দখলবাজি শাসক দল ও সরকারের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছে। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীনভাবে তদন্ত করে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী গতকাল পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভায় দলীয় পরিচয় বিবেচনা না করে মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সভায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির বলেছেন, মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় বিবেচনার সুযোগ নেই। অপরাধীর একমাত্র পরিচয় অপরাধী।
এদিকে, এডভোকেট সুলতানা কামাল, অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, খুশী কবির, শিরীন পারভিন হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও শহিদুল আলমস দেশের ৩৮ বিশিষ্ট নাগরিক গতকাল এক যুক্ত বিবৃতিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়ে বলেছেন, এতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে। তারা বলেন, জনমনের দৃঢ় বিশ্বাস এসব ঘটনা শুধু সন্ত্রাসী কার্যক্রমই নয়। এর সঙ্গে শাসক দলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী মহল, পতিত সরকারের সশস্ত্র অনুসারী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশ সরাসরি জড়িত। এসব ঘটনার অবশ্যই দ্রুত উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী ব্যক্তি, গোষ্ঠী এবং তাদের দেশে-বিদেশে মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
