জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়াই বিএনপির লক্ষ্য

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুববিষয়ক সহ-সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:২৬

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির যুববিষয়ক সহ-সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর বিএনপির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য একটি জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকার এই লক্ষ্য নিয়ে সামনে অগ্রসর হচ্ছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। 

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিএনপি সরকারের অগ্রাধিকার, দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, জামায়াত ও এনসিপির সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক, ঢাকার ফুটপাত ব্যবস্থাপনা, দলের সাংগঠনিক রাজনীতি, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ।

সরকার গঠনের পর বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী—এমন প্রশ্নে মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করা। দীর্ঘদিন মানুষ নানা সমস্যার মধ্যে ছিল। তারা এখন দ্রুত পরিবর্তন দেখতে চায়।”

তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি ও নাগরিক সেবাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। ফলে সরকারকে একদিকে মানুষের তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধানে মনোযোগ দিতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পথও তৈরি করতে হবে।

মীর নেওয়াজ বলেন, “জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় রেখে সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।”

বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, “কেউ বিএনপির পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধ করলে সেটার দায় দল নেবে না। বরং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

তিনি বলেন, “সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অনেক নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কারসহ থানা কমিটি পর্যন্ত বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আমি মনে করি, রাজনৈতিক পরিচয় কখনো অপরাধের ঢাল হতে পারে না। এ বিষয়ে দল খুবই কঠোর।”

দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিএনপির জন্যও এটি একটি বড় পরীক্ষা—দলের নেতাকর্মীদের আচরণ জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে।”

তার মতে, রাজনৈতিক দলের প্রতি জনগণের আস্থা শুধু সরকারের নীতি ও কর্মসূচির ওপর নির্ভর করে না; মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের আচরণও এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যাতে জনগণের ভোগান্তির কারণ না হয়, সে বিষয়ে নেতাকর্মীদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

বিএনপির সঙ্গে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনৈতিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, “রাজনীতিতে প্রতিটি দলের নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান থাকে। নির্বাচন ও বিভিন্ন ইস্যুতে দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে।”

তিনি বলেন, “তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই সব দলের সমন্বয়ে—সেটা সরকারি বা বিরোধী দল, সবার সঙ্গে ঐক্য বজায় রেখে কাজ করছেন।”

তার মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন।

ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গেলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, “মানুষের জীবিকার বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। তবে পথচারীর অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি বলেন, “যেখানে সম্ভব, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা ও সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। পরিকল্পনাহীন উচ্ছেদ যেমন সমাধান নয়, তেমনি ফুটপাত পুরোপুরি দখল হয়ে থাকাও গ্রহণযোগ্য নয়।”

তার মতে, নগর ব্যবস্থাপনায় পথচারীদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক চলাচলের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্থান ও সময় নির্ধারণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে।

বিএনপি সরকারে থাকায় দলটির সাংগঠনিক রাজনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আসছে—এমন প্রশ্নে মীর নেওয়াজ বলেন, “ক্ষমতায় থাকা এবং বিরোধী দলে থাকা—দুই অবস্থায় রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব আলাদা।”

তিনি বলেন, “এখন দলীয় নেতাকর্মীদের জনগণের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত হতে হবে।”

মীর নেওয়াজের মতে, ক্ষমতায় থাকার সময় দলের নেতাকর্মীদের জনগণের সমস্যা আরও গভীরভাবে বুঝতে হবে। জনগণের অভিযোগ ও প্রত্যাশা দলীয় নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারের সেবা সাধারণ মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে দলের নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এতে সরকারের নীতি ও কর্মসূচির বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হবে বলে মনে করেন তিনি।

বিএনপির নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব প্রসঙ্গে মীর নেওয়াজ বলেন, “নতুন প্রজন্মকে সামনে আনতে হবে। রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি নতুন চিন্তা ও প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণাও প্রয়োজন। তরুণদের দায়িত্ব দিতে হবে এবং তাদের নেতৃত্বের সুযোগ তৈরি করতে হবে।”

তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রযুক্তি, নতুন চিন্তা এবং পরিবর্তিত বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞ নেতৃত্বের পাশাপাশি তরুণদের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী চিন্তাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে।

তার মতে, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরি হলে রাজনৈতিক দলগুলো ভবিষ্যতের পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে মানিয়ে নিতে পারবে।

বিএনপি ভবিষ্যতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতার রাজনীতি করবে কি না—এমন প্রশ্নে মীর নেওয়াজ বলেন, “গণতন্ত্রে মতপার্থক্য থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা থাকা প্রয়োজন।”

তিনি বলেন, “বিএনপি তার রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রেখেই প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে পারে। তবে কোনো সমঝোতাই জনগণের স্বার্থের বাইরে হওয়া উচিত নয়।”

তার মতে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হলেও জাতীয় স্বার্থে আলোচনার পথ খোলা রাখা জরুরি। পারস্পরিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে অনেক বিষয়ে সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব।

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে বিএনপির রাজনৈতিক লক্ষ্য তুলে ধরে মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ বলেন, “বিএনপির মূল লক্ষ্য হচ্ছে একটি জবাবদিহিমূলক ও জনগণকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা।”

তিনি বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমার পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া বিএনপির জন্য একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও দায়িত্ব। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা, নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল রাখা এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যেও গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখার মধ্য দিয়েই সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।

মীর নেওয়াজ বলেন, “দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে আমরা চাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে এবং জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে।”

তার মতে, জনগণের আস্থা ও অংশগ্রহণকে সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।

ইত্তেফাক/এমএএম