দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ইংরেজি ভাষা শেখার ওপর জোর দেওয়া হতো। সিউলের প্রকৌশলী, আবুধাবির উদ্যোক্তা, সিঙ্গাপুরের কর্মকর্তা কিংবা প্যারিসের ব্যাংকার—সবার জন্যই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে টিকে থাকতে ইংরেজি জানা প্রায় অপরিহার্য ছিল। তবে বর্তমান যুগে সেই জায়গা দখল করে নিচ্ছে নতুন এক ‘দ্বিতীয় ভাষা’, আর তা হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ৮৬ শতাংশ নিয়োগদাতা মনে করেন যে, এআই ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তি তাদের ব্যবসায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। একই সময়ে কর্মীদের বর্তমান দক্ষতার প্রায় ৩৯ শতাংশ পরিবর্তিত বা অপ্রচলিত হয়ে পড়তে পারে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১০০ কর্মীর মধ্যে ৫৯ জনেরই নতুন প্রশিক্ষণের প্রয়োজন দেখা দেবে। বর্তমানে বিগ ডেটা ও এআই-কে নিয়োগদাতাদের সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে সিঙ্গাপুর। দেশটির স্কিলস অ্যান্ড ওয়ার্কফোর্স ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি সম্প্রতি ২০০টির বেশি এআই কোর্সের একটি বিশাল ক্যাটালগ চালু করেছে।
নির্বাচিত এসব কোর্স সফলভাবে সম্পন্নকারী ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সের যোগ্য নাগরিকেরা ছয় মাসের জন্য চ্যাটজিপিটি প্লাস বা গুগল এআই প্রো-এর মতো প্রিমিয়াম এআই টুল ফ্রি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী লরেন্স ওং জানিয়েছেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নাগরিকদের প্রস্তুত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই নিয়ে সাধারণ বক্তৃতা বা নামেমাত্র স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমেই কেবল এআই-দক্ষতা অর্জন সম্ভব।
অনেকেই বর্তমানে চ্যাটজিপিটিকে সাধারণ প্রশ্ন করা, ই-মেইল রিরাইট করা, বড় নথি সংক্ষেপ করা বা ছবি তৈরির কাজে ব্যবহার করছেন। তবে প্রকৃত ‘এআই-ফ্লুয়েন্সি’ হলো কোনো কাজ শুরু করার আগেই চিন্তা করা যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে সেই কাজটিকে আরও নিখুঁত ও দ্রুত সম্পন্ন করতে পারে।
একটি গবেষণায় ৬৬টি প্রতিষ্ঠানের ৭ হাজার ১৩৭ জন কর্মীর ওপর চালিয়ে দেখা গেছে, দৈনন্দিন কাজে এআই সহকারী ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়ায় কর্মীরা সপ্তাহে প্রায় দুই ঘণ্টা কম সময় ই-মেইলে ব্যয় করেছেন। এছাড়া লিঙ্কডইনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর থেকে ব্যবহারকারীদের প্রোফাইলে এআই-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা যোগ করার হার ১৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সিঙ্গাপুর ইতিমধ্যে এআই-দক্ষতা পরিমাপের জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছে। ‘এআই রেডি কুইজ’ নামের ১৫ থেকে ২০ মিনিটের একটি অনলাইন পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের তিনটি স্তরে মূল্যায়ন করা হয়: এআই অ্যাওয়ার (সচেতন), এআই লিটারেট (সাক্ষর) ও এআই ফ্লুয়েন্ট (দক্ষ)।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই-দক্ষতা যেন নতুন কোনো সামাজিক বিভাজনের কারণ হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে গভীর নজর রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক, নার্স, কৃষক, আইনজীবী কিংবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা—সবারই মৌলিক এআই জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে ইন্টারনেট ব্যবহারের মতোই সাধারণ ও বাধ্যতামূলক একটি দক্ষতায় পরিণত হতে চলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
