‘আল্লাহ, আমার পুড়ি (মেয়ে) কী করে খাবো, আমি কী করে খাওয়াবো? আমার জামাই মইরা গেছে। আমার নাতিন আর পুতিও মইরা গেছে। সব হারাইছি। আমার সব শেষ গো, আল্লাহ গো।’
সকালে স্বজনদের মুখে হাসি ফুটিয়ে বিদায় জানিয়েছিলেন ৭০ বছর বয়সী বৃদ্ধা রহিমা বেগম। মেয়ে, জামাতা, নাতনি ও নিষ্পাপ পুতিকে সুস্থভাবে বিদায় দেওয়ার মাত্র কিছুক্ষণ পরই তার কাছে পৌঁছায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর। চোখের পলকে পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। কোনো সান্ত্বনাই তার বুকফাটা কান্না থামাতে পারছে না।
ময়মনসিংহে রাজিব পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ সাতজন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার (২ অক্টোবর) দুপুরে ঘটা এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার খবর গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের বুকফাটা কান্না আর আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।
দুর্ঘটনায় নিহত সাতজনের মধ্যে ছয়জনেরই বাড়ি জামালপুর সদর উপজেলার রানাগাছা ও শরিফপুর ইউনিয়নে। এর মধ্যে রানাগাছা ইউনিয়নের দড়িহামিদপুর ভাটিপাড়া গ্রামের একই পরিবারের চারজন হলেন—৭০ বছর বয়সী রাশিদা বেগম, তার ছেলে মোফাজ্জল হোসেন লেবু (৫০), মোফাজ্জলের বিবাহিত মেয়ে মর্জিনা আক্তার (২৫) এবং মর্জিনার পাঁচ বছর বয়সী শিশুপুত্র মিনান। নিহত অপর তিনজন হলেন শরিফপুর ইউনিয়নের বাদেচান্দি গ্রামের বাসিন্দা আকরাম হোসেন (৪৫), তার স্ত্রী মমতা বেগম (৩৮) এবং অটোরিকশাচালক সুজন মিয়া (৪৫)। চালক সুজনের বাড়ি রানাগাছা ইউনিয়নের বীর গোবিন্দবাড়ী গ্রামে।
পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দুপুর সোয়া একটার দিকে ময়মনসিংহ নগরীর আকুয়া বাইপাস এলাকার বাংলাদেশ ব্যাংক ভবনের কাছে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নান্দিনা থেকে ময়মনসিংহগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশাটিকে বিপরীত দিক থেকে আসা রাজিব পরিবহনের একটি দ্রুতগতির বাস সরাসরি চাপা দেয়। এতে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে ঘটনাস্থলেই যাত্রীদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
নিহতদের স্বজনরা জানান, পেশায় নির্মাণশ্রমিক মোফাজ্জল হোসেন লেবু স্ত্রী ও এক সন্তানকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গাজীপুরের হোতাপাড়া এলাকায় বসবাস করছিলেন। মা, মেয়ে ও নাতিকে নিজের কাছে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই আগের দিন বৃহস্পতিবার তিনি নান্দিনার গ্রামের বাড়িতে আসেন। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তারা বাড়ি থেকে রওনা হন। পরিকল্পনা ছিল অটোরিকশায় চড়ে প্রথমে ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছাবেন এবং সেখান থেকে বাসে করে গাজীপুর যাবেন। কিন্তু পথিমধ্যেই বাসের বেপরোয়া গতি তাদের জীবনের সব হিসাব-নিকাশ চুরমার করে দেয়।
একসঙ্গে পরিবারের চারজনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মোফাজ্জলের স্বজনেরা। তার আত্মীয় ইসমতারা কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, লেবু দিনমজুরি করে পরিবার চালাতেন। শাশুড়ি, অন্তঃসত্ত্বা ভাতিজি ও নাতিকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্যই তিনি গ্রামে এসেছিলেন। মর্জিনা দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক নিমেষেই পুরো পরিবারটি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজিব পরিবহনের বেপরোয়া চলাচলের কারণে সড়কে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। গত ২০ মাসে এই একটি পরিবহন সংস্থার বাসের আঘাতেই অন্তত ৯টি পৃথক দুর্ঘটনায় ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটল। নতুন করে সাতজনের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো অঞ্চলে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে দুর্ঘটনার পর জামালপুর-মুক্তাগাছা-ময়মনসিংহ রুটে রাজিব পরিবহনের স্বাভাবিক বাস চলাচল সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়। শুক্রবার বিকেলে জামালপুর শহরের বজরাপুর কাউন্টারে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রী তোলা হলেও নিয়মিত পথের বদলে বিকল্প পথে বাস ঢাকার দিকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছিল পরিবহন কর্তৃপক্ষ। মর্মান্তিক এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
