অন্যের মাধ্যমে দোয়া করানো কতটা সঠিক? শায়খ আহমাদুল্লাহর ব্যাখ্যা

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪৫

সমাজে বিপদ-আপদ, অসুস্থতা, নতুন কোনো কাজের শুরু কিংবা পারিবারিক সংকটে আলেম-ওলামা বা নেককার ব্যক্তিদের কাছে দোয়া চাওয়ার প্রচলন রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, নিজের দোয়ার পাশাপাশি কোনো আলেমকে দিয়ে দোয়া করালে তা বিশেষভাবে কবুল হতে পারে। তবে ইসলামে নিজের জন্য নিজে দোয়া করা এবং অন্যের কাছে দোয়া চাওয়ার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।

ইসলামী চিন্তাবিদ ও আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ তার এক আলোচনায় এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আল্লাহর কাছে সরাসরি দোয়া করা প্রত্যেক বান্দার জন্য উন্মুক্ত এবং এটিই দোয়ার মৌলিক পদ্ধতি।

১. নিজের দোয়া নিজে না করার হীনমন্যতা ও আল্লাহর ওপর ধারণা

শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা আমার কাছে দোয়া করো, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করব (সুরা গাফির: ৬০)।’ এখানে আল্লাহ সরাসরি তার বান্দাকে ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাড়াদানের ওয়াদাও করেছেন। অথচ আমরা অনেকেই নিজেদের পাপী মনে করে কিংবা হীনমন্যতায় ভুগে আল্লাহর কাছে সরাসরি চাইতে ইতস্তত করি।’

এই হীনমন্যতা দূর করতে শয়তানের দোয়ার উদাহরণও টেনেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি জানান, শয়তান যখন আল্লাহর চরম অবাধ্যতা করে অভিশপ্ত হলো, তখনও সে আল্লাহর কাছে কিয়ামত পর্যন্ত হায়াত চেয়ে দোয়া করেছিল, আর আল্লাহ তাআলা সাথে সাথেই তার সেই দোয়া কবুল করেছিলেন।

ইসলামী এই স্কলার প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘শয়তানের মতো অভিশপ্ত সত্তার দোয়া যদি আল্লাহ ফিরিয়ে না দেন, তবে একজন ঈমানদার বান্দার দোয়া তিনি কীভাবে ফিরিয়ে দেবেন? হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেছেন, ‘বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা করে, আমি তার সাথে তেমন আচরণ করি। তাই আল্লাহর প্রতি সুধারণা রেখে সরাসরি তার কাছেই চাওয়া আবশ্যক।’

২. ‘দোয়ার টেন্ডার’ প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা

সমাজে প্রচলিত একটি প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করতে ‘দোয়ার টেন্ডার’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘‘আমরা যেন মনে করি আল্লাহ তাআলা দোয়ার সমস্ত ‘টেন্ডার’ বা দায়িত্ব কেবল আলেম-ওলামাদের দিয়ে রেখেছেন।’’

বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তি আপনাকে সরাসরি ডেকে বলেন, ‘আপনার যা যা প্রয়োজন—গাড়ি, বাড়ি, চাকরি বা অর্থ আমার কাছে সরাসরি চেয়ে নিন, আমি দেব’, তখন কি আপনি অন্য কাউকে আপনার হয়ে চাইতে পাঠাবেন? নিশ্চয়ই না! তবে, বিশ্বজাহানের মালিক আল্লাহ যখন তার প্রতিটি সাধারণ ও খাস বান্দাকে প্রতিদিন তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার এবং চাওয়ার অফার দিয়েছেন, তখন আমরা কেন অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ব?’

৩. অন্যের কাছে দোয়া চাওয়া কি জায়েজ?

নিজের জন্য নিজে দোয়া করার পাশাপাশি অন্য কোনো নেককার ব্যক্তি বা দ্বীনি ভাইয়ের কাছে নিজের জন্য দোয়া করার অনুরোধ জানানোকে ভিন্ন বিষয় হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কেউ যদি বলেন, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন’—তাহলে তার জন্য দোয়া করা বৈধ। বিশেষ করে কোনো মুসলিম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করলে দোয়াকারীর জন্যও ফেরেশতারা অনুরূপ কল্যাণের দোয়া করেন—এমন বর্ণনা হাদিসে রয়েছে।

অর্থাৎ অন্যের কাছে নিজের জন্য দোয়া চাওয়া এবং কোনো ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক বা আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মাধ্যমে ‘দোয়া করানোর’ বিষয় এক নয়।

৪. দোয়া বা প্রার্থনার তিনটি রূপ: ইসলাম কী বলে?

ইসলামে দোয়ার আমলটিকে শায়খ আহমাদুল্লাহ তিনটি ভাগে ভাগ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন:

দোয়া করা (নিজের জন্য নিজে দোয়া করা): এটিই ইসলামের সবচেয়ে মূল, গুরুত্বপূর্ণ এবং সুন্নাহসম্মত মাধ্যম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা এটিই সবচেয়ে বেশি ছেড়ে দিয়েছি।
দোয়া চাওয়া (অন্যের কাছে দোয়ার অনুরোধ করা): কোনো নেককার ব্যক্তি বা দ্বীনি ভাইয়ের কাছে গিয়ে বলা, ‘ভাই, আমার জন্য একটু দোয়া করবেন’—এটি শরিয়তে সম্পূর্ণরূপে জায়েজ ও গ্রহণযোগ্য। কোনো ভাই দোয়ার অনুরোধ করলে সাথে সাথে তাৎক্ষণিক মৌখিক দোয়া (যেমন: ‘ফি আমানিল্লাহ’ বা ‘আল্লাহ তোমার কল্যাণ করুন’) দেওয়া উচিত। হাদিস অনুযায়ী, কেউ যখন আড়ালে তার অপর ভাইয়ের জন্য দোয়া করে, ফেরেশতারা তখন দোয়াকারীর জন্য একই কল্যাণের দোয়া করেন।

বাজেট ও আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে দোয়া আয়োজন: টাকা-পয়সার বাজেট করা, খানা-পিনা, মোমবাতি, আগরবাতি, গোলাপজল দিয়ে হুজুর বা লোক ভাড়া করে এনে দোয়া করানোর রীতি অনেক এলাকায় দেখা যায়। শায়খ আহমাদুল্লাহ স্পষ্ট করে বলেছেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কিংবা তার সাহাবিদের যুগে কোনো নির্দিষ্ট বাজেটের বিনিময়ে বা খাবার খাইয়ে ‘দোয়া করানো’র এমন কোনো নিয়ম বা অপশন শরিয়তে ছিল না। এটি ইসলামের কোনো সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি নয়।

৫. দোয়া কবুলের বিষয়টি কীভাবে বুঝবেন?

অনেক সময় মানুষ দোয়া করার পর দ্রুত ফল না পেলে হতাশ হয়ে পড়েন। কিন্তু ইসলামী দৃষ্টিতে দোয়ার ফল সবসময় মানুষের প্রত্যাশিত পদ্ধতিতে প্রকাশ পায় না।

শায়খ আহমাদুল্লাহর আলোচনায় দোয়ার জবাবের তিনটি সম্ভাব্য দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, বান্দা যা চেয়েছে আল্লাহ তা-ই দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, চাওয়া বিষয়ের পরিবর্তে তার জন্য আরও কল্যাণকর কিছু দিতে পারেন। তৃতীয়ত, দুনিয়ায় এর প্রতিদান না দিয়ে আখেরাতের জন্য তা সংরক্ষণ করতে পারেন।

বিষয়টি বোঝাতে তিনি শিশুর উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘দুই বছরের একটি শিশু যখন তার মায়ের কাছ থেকে ধারালো ছুরি পেতে কান্নাকাটি করে, মা কিন্তু পরম ভালোবাসাতেই তাকে ছুরি দেন না; বরং একটা খেলনা এনে দেন, কারণ ছুরি দিলে শিশুটির হাত কেটে যাবে। আমরাও অনেক সময় নিজেদের জন্য ক্ষতিকর জিনিস আল্লাহর কাছে চেয়ে বসি এবং না পেলে কষ্ট পাই।’

৬. দোয়ার ফল বুঝতে ধৈর্য জরুরি

নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথাও আলোচনায় তুলে ধরেছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি জানান, ছাত্রজীবন শেষে নিজ জেলার একটি মাদরাসায় শিক্ষকতার সুযোগ পেয়েও সেটি হারিয়ে তিনি কষ্ট পেয়েছিলেন। পরে ঢাকার একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে বড় সুযোগ পাওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেন, আগের সুযোগটি না পাওয়ার পেছনেও হয়তো কল্যাণ ছিল।

দোয়ার ক্ষেত্রে তাই নিজের চাওয়া পূরণ না হলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখা গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে নিজের প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য সরাসরি আল্লাহর কাছে দোয়া করার পাশাপাশি অন্য মুসলিমের কাছে দোয়ার অনুরোধ করাও পৃথকভাবে করা যেতে পারে।

ইত্তেফাক/এনটিএম