ঢাকার মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সংস্কার ও মেরামতের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। সেবাকেন্দ্রটিতে নতুন দরজা-জানালা বসানোর পাশাপাশি চলছে রঙের কাজ। এর মধ্যেই মূল ভবনের বাইরে টিনের ছাউনিতে টিকা দেওয়া, নারীদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরামর্শের মতো সীমিত কিছু সেবা দেওয়া অব্যাহত আছে।
তবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, আসবাব ও কক্ষগুলো এখনো প্রস্তুত হয়নি। পুরোদমে স্বাস্থ্যসেবা দিতে আরও সময় লাগবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটিতে গিয়ে দেখা যায়, ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই টিনের ছাউনির নিচে চেয়ার-টেবিল পাতা। সেখানেই দেওয়া হচ্ছে শিশুদের টিকা ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবা। গত কয়েক দিন ওই কেন্দ্রের ভেতরের দুটি কক্ষে সেবা দেওয়া হয়েছিল। শনিবার ওই দুটি কক্ষসহ আরও কিছু কক্ষে নতুন করে রং দেওয়ার কাজ চলছে। ফলে কক্ষের বাইরে ছাউনির নিচে সেবা দেওয়া হচ্ছে। এই ছাউনি আগে থেকেই ছিল। হামলার আগে ছাউনিতে মূলত নিবন্ধনসহ টুকটাক কাজ হতো।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুসারে, শনিবার মোট ৫৬ জনকে সেবা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। ২১ জন নারী স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে দৈনিক গড়ে ৪০০ মানুষকে সেবা দেওয়া হতো। এদের বেশির ভাগই নারী ও গর্ভবতী মা। শ খানেক শিশুকে টিকা দেওয়া হতো।
মিরপুর-১-এ অবস্থিত রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে দুটি একতলা ভবন রয়েছে। একটিতে মূল সেবা দেওয়া হতো। আরেকটি ভবন প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে। পরে ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল লুট করে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির অনেক স্থাপনা, দেয়াল গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
সংস্কার এগিয়ে চলছে
হামলার সময় সেবাকেন্দ্রটির সামনের ও পেছনের বারান্দার দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পরে ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টার করা হয়েছে। শনিবার দেয়ালে রং করতে দেখা গেছে। বিভিন্ন কক্ষে নতুন লোহার গ্রিল, জানালার কপাট ও দরজা বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। টিনের ছাউনির পেছনে কর্মীদের বসা ও খাবার কক্ষ এবং পাশের দাপ্তরিক ভবনেও সংস্কারকাজ চলানো হচ্ছে। পানির ট্যাংক বসিয়ে সংযোগ দেওয়া হয়েছে। শৌচাগারগুলো ব্যবহার উপযোগী করতে মেরামত করা হচ্ছে। পেছনের সীমানাদেয়ালের ইটের গাঁথুনি ও প্লাস্টারের কাজও শেষ হয়েছে। এরপর রং করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মীরা।
রাড্ডার কর্মকর্তারা বলছেন, ভবনের কাঠামোগত সংস্কারের কাজ দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। তবে এখনো ভেতরের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সরঞ্জাম ও কক্ষগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। সংস্কারের কাজ শেষ হলেই যে আগের মতো পুরোপুরি স্বাস্থ্যসেবা চালু করা যাবে, তা বলা কঠিন। প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ ও কক্ষ প্রস্তুত করতে আরও সময় লাগবে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, সংস্কারের কাজ শেষ হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। শুরুতে তারা যেভাবে দ্রুত কাজ শেষ হবে বলে ধারণা করেছিলেন, বাস্তবে তা হচ্ছে না। ছোটখাটো অনেক কাজ এখনো বাকি। তাই ঠিক কবে নাগাদ পুরোপুরি সেবা চালু করা যাবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে যত দ্রুত সম্ভব সেবার পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
বৃহস্পতিবারের মধ্যে সংস্কার
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাঠামোগত সংস্কারের কাজ চলছে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের অর্থায়নে। গত রোববার বিকেলে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে তিনি সেবাকেন্দ্রটি মেরামত ও সংস্কার করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন।
শনিবার সন্ধ্যায় আমিনুল হক বলেন, সংস্কারকাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। আগামী বৃহস্পতিবারের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ শেষ করে সেবাকেন্দ্রটি কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
সেবাকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য আসবাব ও সরঞ্জামের বিষয়ে আমিনুল হক বলেন, আপাতত নিজস্ব অর্থায়নে তিনি সংস্কারকাজ করে দিচ্ছেন। রাড্ডা থেকে লুট হওয়া দুই ট্রাক পণ্য উদ্ধার করা হয়েছে এবং সেগুলো পুলিশ প্রশাসনের জিম্মায় রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় সেগুলো কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এরপর কী কী আছে এবং কী কী নেই, তা জানা যাবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী সময়ে সহযোগিতা করা হবে।
প্রয়োজন যন্ত্রপাতি ও আসবাব
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, সেবাকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সেবা চালুর বিষয়ে রাড্ডা ট্রাস্টের সঙ্গে আলোচনা চলছে। পরিবার পরিকল্পনা সেবার জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন চিকিৎসা উপকরণ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাওয়া যাবে। টিকাগুলো সিটি করপোরেশন থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সরঞ্জামের জন্য সরকারের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।
সেবাকেন্দ্রটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম নষ্ট বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানিয়ে নাসরিন আখতার বলেন, এর মধ্যে দুটি আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন ও সেগুলোর কালার প্রিন্টার, কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ফ্রিজ, জেনারেটর ও তিনটি বড় এসি লুট করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা সেবার উপকরণ, রোগীদের ব্যবহারের বিশেষ বিছানা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও অটোক্লেভ মেশিনও ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন সেবাকক্ষে চিকিৎসকদের বসার স্থান ও চিকিৎসা উপকরণ, টেবিল, চেয়ার, ফাইল ক্যাবিনেট, স্টিলের আলমারি ও ওষুধ রাখার আসবাবও লুটপাট বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ভাঙচুরের পর কী কী সরঞ্জাম উদ্ধার করা গেছে এবং সেগুলো ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের তালিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রী পরীক্ষা করে দেখার পর নতুন করে কী কী প্রয়োজন হবে, তা নির্ধারণ করা যাবে।
