রাজধানীর মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের চরম অবহেলা, ভুল চিকিৎসা এবং অতিরিক্ত মাত্রায় (ওভারডোজ) অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণে সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আভানের মৃত্যুর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
নিহত শিশুর বাবা মো. মৃদুল ইসলাম অভিযোগ করে জানান, সামান্য জ্বর ও পেটে ব্যথা নিয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর আভানকে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর চিকিৎসকেরা তাকে ডেঙ্গু রোগী হিসেবে সন্দেহ করে চিকিৎসা শুরু করেন। তবে হাসপাতালে দফায় দফায় রক্ত ও ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো হলেও প্রতিবারই রিপোর্ট ‘নেগেটিভ’ আসে।
মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাচ্চা সুস্থ বাচ্চা, হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। আমার বাচ্চা ফেরত দেন আর কিছু লাগবে না। আমার বাচ্চাটা; শোনেন, বিশ্বাস করেন- আমি চাকরি করি না বাচ্চাকে স্কুলে দিব বলে। আমি ছোট ছোট কাজ করি। আমার বাচ্চা ফেরত দেন।’
তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার স্ত্রী প্ল্যান করেছি- আর বাচ্চা নিব না। নয়তো আভানের ভালোবাসা কম হবে। ওকে কারও কাছে দেই না। ওকে আমি বাইকে নিয়ে ঘুরি। সে একটা রেড কার কিনবে বলেছে- আমি টাকাও জমা দিয়েছি।’
সন্তান হারানোর শোকে বারবার বিলাপ করে মৃদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাই আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই। আমার ছেলেটারে ওরা মেরে ফেলল ভাই…। সে নাই আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আমাকে মেরে ফেলেন। বিশ্বাস করেন আমার ছেলে হেঁটে হেঁটে হাসপাতালে এসেছে। তাকে ভুল চিকিৎসা দিয়ে ওরা মেরে ফেলেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটা কিছু আমাকে বলবে না। তিন দিন ওয়ার্ডে; সে খাচ্ছে। বাসা থেকে চিকেন নিয়ে আসছে সেমাই নিয়ে আসছে, ভিডিও আছে আমাদের কাছে। সে খাচ্ছে আর আমাকে কাছে বলছে- বাবা তুমি চলে আসো, আমি এখানে থাকব না।’
পরিবারের অভিযোগ, ডেঙ্গুর সুস্পষ্ট কোনো আলামত না থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকেরা সেই পথেই চিকিৎসা চালিয়ে যান এবং উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে থাকেন।
স্বজনরা জানান, গত ২ অক্টোবর হঠাৎ করেই শিশুটির শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, শিশুটির পালস পাওয়া যাচ্ছে না এবং তাকে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিতে হবে। এ সময় পরিবার শিশুটিকে অন্য কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে চাইলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ টালবাহানা শুরু করে। এমনকি শিশুর বর্তমান শারীরিক পরিস্থিতির লিখিত কেস সামারি চাইলেও তা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে কালক্ষেপণ করা হয়।
পারিবারিক সূত্রে আরও জানা যায়, আইসিইউতে স্থানান্তরের পরও কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সরাসরি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল চিকিৎসক মুঠোফোনে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং সে অনুযায়ী অনভিজ্ঞ হাতে চিকিৎসা চলছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দফায় দফায় উন্নতির মিথ্যা আশ্বাস দিলেও ৩ অক্টোবর বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে শিশু আভানের মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর দায় এড়াতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসার নথিপত্র ও রিপোর্ট আটকে রাখার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেন স্বজনরা। পরবর্তীতে চাপের মুখে হস্তান্তর করা মেডিকেল ডকুমেন্টে শিশুটির রক্তে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন এবং শক সিন্ড্রোমের প্রমাণ পাওয়া যায়।
শিশু আভানের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে শোকাহত পরিবার।