আর্জেন্টিনার পাতাগোনিয়া উপকূলে একের পর এক মৃত তিমি শাবক ভেসে আসছে। স্থানীয়রা বলছেন, সংখ্যাটা কয়েকশো ছাড়িয়ে গেছে। এবার বিজ্ঞানীরা আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছেন এই অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ খুঁজতে।
চুবুত প্রদেশের পেনিনসুলা ভালদেস এলাকায় বালিয়াড়িতে মৃত শাবকদের দেখা মিলছে। এই অঞ্চল সাদার্ন রাইট হোয়েলের অন্যতম প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। উনিশ ও বিশ শতকে অবাধ শিকারের কারণে প্রজাতিটি প্রায় বিলুপ্তির মুখে পড়েছিল। এখন বাচ্চা প্রসব ও শাবক লালন-পালনের জন্য তারা এই শান্ত ও সুরক্ষিত জলে জড়ো হয়।
তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাদার্ন রাইট হোয়েল হেলথ মনিটরিং প্রোগ্রামের প্রধান মারসেলা উহার্ট। তিনি ইউনিভার্সিটি অভ ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিসের ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউটের পশুচিকিৎসক। উহার্ট বলেন, এই নির্দিষ্ট দলের ওপর ২৩ বছর ধরে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ চলছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা নিশ্চিত, এবারের ঘটনা অস্বাভাবিক।
বিজ্ঞানীদের প্রধান অনুমান‘কেল্প গাল’ নামের সামুদ্রিক পাখিগুলো। দীর্ঘদিন ধরেই এই পাখিরা পানির ওপরে ভেসে ওঠা তিমিদের গায়ে ঠোকর মারে এবং চামড়া ও চর্বি খুঁটে খায়। পূর্ণবয়স্ক তিমিরা শিখে গেছে পিঠ পানির নিচে রেখে শুধু মাথা ভাসিয়ে শ্বাস নিতে। কিন্তু ছোট শাবকরা এখনো এই কৌশল আয়ত্ত করতে পারেনি। ফলে পাখির ঠোকরে তৈরি ক্ষত দিয়ে সামুদ্রিক ব্যাকটেরিয়া ঢুকে সংক্রমণ ঘটাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুয়ের্তো মাদরিন শহরের উপকূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সৈকতের কাছেও মরদেহ ভেসে আসছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গবেষকরা এখনো কোনো সঠিক সংখ্যা জানাচ্ছেন না। নভেম্বরের শেষে মৌসুম শেষ হলে প্রকৃত পরিসংখ্যান স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছেন তারা।
উহার্টের নেতৃত্বে জীববিজ্ঞানী, পশুচিকিৎসক ও পার্ক রেঞ্জারদের দল উপকূল, নৌকা, উড়োজাহাজ ও ড্রোন ব্যবহার করে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। কাজটা সহজ নয়। পচন ধরার আগেই ছবি তোলা, পরীক্ষা করা এবং চামড়া ও অঙ্গের নমুনা সংগ্রহ করতে হচ্ছে। নমুনাগুলো তান্ডিল শহরের পশুচিকিৎসা স্কুলে পাঠানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে টিস্যুতে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এখন কালচার করে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা চলছে আসলেই সংক্রমণই মৃত্যুর কারণ কি না।
যদি ব্যাকটেরিয়াই দায়ী হয়, তাহলে এ বছর কেন এত প্রাণঘাতী হয়ে উঠল, সেটাও খুঁজে দেখতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন বা এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে ওঠায় ব্যাকটেরিয়া আরও শক্তিশালী হয়ে শাবকদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল হোয়েলিং কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ‘রাইট হোয়েল’ নামের উৎপত্তি শিকারিদের কাছ থেকেই। ধীর গতি, উপকূলের কাছাকাছি থাকা এবং মারা গেলে পানিতে ভেসে থাকার কারণে শিকারিরা এদের সবচেয়ে ‘সঠিক’ শিকার মনে করত। ১৯৩৫ সালে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাওয়ার পর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করে। তবে খাদ্য সংকট, জালে আটকে পড়া, তেল ছড়িয়ে পড়া আর জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ এসব হুমকি এখনো রয়ে গেছে।
এভাবে বারবার বড় সংখ্যায় শাবক মারা গেলে প্রজাতির বংশবৃদ্ধি আরও ধীর হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা।
