দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়াতে বড়পুকুরিয়া খনির উত্তর ও দক্ষিণ অংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের চিন্তা করছে সরকার। প্রাথমিকভাবে গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমীক্ষা ও প্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) হিসাবে, দুই অংশ থেকে প্রায় ১৭ কোটি টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন উত্তোলন করা গেলে ২৮ থেকে ৩০ বছর কয়লা উৎপাদন চালানো সম্ভব হতে পারে।
পেট্রোবাংলা এবং বিসিএমসিএল সূত্র জানায়, জ্বালানি সংকট এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে এলএনজি, তেল ও কয়লা আমদানির চ্যালেঞ্জ ও আর্থিক ঘাটতি দেশীয় কয়লা বড় আকারে উত্তোলনের চিন্তা করছে সরকার। বর্তমান ভূগর্ভস্থ পদ্ধতির পাশাপাশি এখন খনিটির উত্তর ও দক্ষিণ অংশে উন্মুক্ত পদ্ধতিতেও বড় পরিসরে কয়লা উত্তোলনের চিন্তা সে সূত্র ধরেই। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহণ প্রয়োজন। এজন্য নীতিগত অনুমোদন ও দিকনির্দেশনা চেয়ে গত ২ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পত্র দিয়েছিল পেট্রোবাংলা। তবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও খনি উন্নয়নে প্রায় সাত-আট বছর সময় লাগতে পারে। জমি অধিগ্রহণ, ১৮ থেকে ২০ হাজার মানুষের পুনর্বাসন, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলা—এ পরিকল্পনার বড় চ্যালেঞ্জ।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় খনির বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এক উপস্থাপনার মাধ্যমে তুলে ধরে বিসিএমসিএল। সেখানে গত ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানানো হয়। বিদ্যমান ও নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য আমদানি কমিয়ে দেশীয় কয়লা ব্যবহারের চিন্তা থেকেই এ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
প্রায় দুই যুগ ধরে উত্তোলন পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক ও সিদ্ধান্তহীনতায় দেশের কয়লা সম্পদের বড় অংশ অব্যবহৃত রয়েছে। পাঁচটি কয়লাখনির মধ্যে শুধু বড়পুকুরিয়া থেকে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে। এ কয়লা সেখানকার বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হলেও কেন্দ্রটি প্রায়ই বন্ধ থাকছে। এ অবস্থায় বর্তমান ভূগর্ভস্থ পদ্ধতির পাশাপাশি উত্তর ও দক্ষিণ অংশে উন্মুক্ত খননের পরিকল্পনা সামনে এসেছে।
উত্তোলনযোগ্য কয়লা ১৭ কোটি টন
বিসিএমসিএলের তথ্য অনুযায়ী, খনির উত্তরাংশের আয়তন ২ দশমিক ৮১ এবং দক্ষিণাংশের আয়তন ২ দশমিক ২২ বর্গকিলোমিটার। দুই অংশ মিলিয়ে সম্ভাব্য উন্মুক্ত খনন এলাকার আয়তন ৫ দশমিক ৩ বর্গকিলোমিটার। উত্তরাংশে মজুত ১৩ কোটি ৫০ লাখ এবং দক্ষিণাংশে ৫ কোটি ৪০ লাখ টন কয়লা। মোট ১৮ কোটি ৯০ লাখ টন মজুদের ৯০ শতাংশ উত্তোলন করা যাবে ধরে উত্তোলনযোগ্য কয়লার পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৭ কোটি টন।
কোম্পানির উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, দুই অংশে কয়লার স্তর প্রায় ১১৮ থেকে ২৫৬ মিটার গভীরতায় রয়েছে। ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে মোট মজুদের মাত্র ১০-১২ শতাংশ উত্তোলন সম্ভব হতে পারে। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে প্রায় ৯০ শতাংশ কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরাংশে কয়লার তুলনায় ওপরের মাটি অপসারণের অনুপাত ৩ দশমিক ৩:১ এবং দক্ষিণাংশে ৬ দশমিক ৩:১। কোম্পানির মতে, এ অনুপাত তুলনামূলক কম হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কম হতে পারে। দুর্ঘটনা ও খননঝুঁকিও তুলনামূলক কম। আর দেশীয় ব্যবহার বাড়লে আমদানিনির্ভরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমবে। পাশাপাশি কাওলিন, ক্লে ও সিলিকা স্যান্ড পাওয়া যেতে পারে, যা সিরামিক, মৃৎশিল্প ও কাচশিল্পে ব্যবহারযোগ্য।
আগেও সমীক্ষার সুপারিশ
২০১৪ সালে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের সমীক্ষায় পাম্পিং ও আংশিক প্রতিবন্ধক ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি ব্যবস্থাপনা সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে বিস্তারিত কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জন টি বয়েড পরিবেশ, ভূগর্ভস্থ পানি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার সুপারিশ করে। ২০১৯ সালে জার্মান বিশেষজ্ঞ ড. থমাস ভন স্কয়ার্জনবার্গও উন্মুক্ত খননের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ করেন। সমীক্ষার অনুমোদন চেয়ে ২০২৩ সালে প্রস্তাব পাঠানো হয়। ২০২৫ সালেও সমীক্ষার নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হয়। সর্বশেষ ২ জুলাই ২০২৬ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পত্র পাঠায় পেট্রোবাংলা। এতে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শসংক্রান্ত বিশ্লেষণ সম্পন্ন করতে নীতিগত অনুমোদন ও দিকনির্দেশনা চাওয়া হয়।
পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানান, বড় পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত খননের বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সমীক্ষার ফল, পুনর্বাসন, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত প্রভাবের ওপর। বিস্তারিত সমীক্ষা ও অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতেই প্রকল্প বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে।
২০২৭ সালের পর উৎপাদন নিয়ে প্রশ্ন
বড়পুকুরিয়ার কেন্দ্রীয় অংশে ভূতাত্ত্বিক মজুত ২২ কোটি ১০ লাখ টন। ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত উত্তোলন হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার টন। রিকভারি রেট ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ। বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা বছরে ১০ লাখ টন।
চলমান চুক্তিতে ৪৫ লাখ টন উত্তোলনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রায় ৩৮ লাখ ৩৫ হাজার টন উত্তোলন হয়েছে। কোম্পানির হিসাবে, বাকি রয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার টন। পেট্রোবাংলার কমিটি অতিরিক্ত প্রায় ৩ লাখ ৬৯ হাজার টন উত্তোলনের সুপারিশ করেছে। অনুমোদন পেলে মোট ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার টন উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হবে।
বর্তমান চুক্তি শেষ হবে ২৯ ডিসেম্বর ২০২৭। এরপর আবারও চীনা কোম্পানির সঙ্গে নতুন চুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন চালু রাখতে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের দলিল তৈরির কাজও চলছে। তবে উপস্থাপনায় আশঙ্কা করা হয়েছে, ২০২৭ সালের পর কেন্দ্রীয় অংশে উত্তোলনযোগ্য মজুত না থাকায় নতুন অংশে উৎপাদন শুরুর পূর্ব পর্যন্ত খনি বন্ধ থাকতে পারে।
অন্য খনিতেও সমীক্ষার পরিকল্পনা
বড়পুকুরিয়া ছাড়াও অন্য কয়লাক্ষেত্রেও সমীক্ষার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জামালগঞ্জের উত্তর-পশ্চিমের ১৫ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বছরে ২০ লাখ টন করে ৩০ বছরে ৬ কোটি টন উত্তোলনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ৩০ মাসের প্রাথমিক সমীক্ষার পরিকল্পনা রয়েছে। খালাসপীরে একই উৎপাদন লক্ষ্যে ৪৮ মাসের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার প্রস্তাব রয়েছে। দীঘিপাড়ায় বছরে ৩০ লাখ টন করে ৩০ বছরে ৯ কোটি টন উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে।
