ইট-পাথরের চিপায় পড়ে শান্তি গেছে মরে/ আমি আবার যাবো শান্তিপুরে, আমার শান্তি মাটির ঘরে।—মরমীবাদের এই গান গাইতে গাইতে আমাদের পথচলা শুরু। উদ্দেশ্য দেশের সবচেয়ে বড় মাটির বাড়ি। বর্তমান যুগে মাটির বাড়ি দেখলে খানিকটা অবাক হতে হয়! আর সেখানে যদি ৬০ বছরের পুরোনো, আর ১০৮ ঘরের এক বিশাল অট্টালিকার খোঁজ পেয়ে থাকি তাহলে বিস্মিত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
৯ ঘণ্টার যাত্রা শেষে আমরা পৌঁছাই নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলা সদরের চেরাগপুর ইউনিয়নের আলীপুর গ্রামে। গ্রামের মাটিতে পা দিতেই বেশ কয়েকজন যুবকের মুখোমুখি হলাম। তাদের প্রশ্ন, কোথায় যাবো? মাটির বাড়ি বলতেই তারা পথ বাতলে দিলেন। তাদের দেখানো পথে হাঁটতে গিয়ে হঠাত্ টের পেলাম, হয়তো কাছাকাছি এসে গেছি!
কারণ আমরা বেশ লম্বা একটি মাটির ঘর দেখতে পাচ্ছি। আসার পথে অনেক মাটির ঘর দেখলেও এটিই সবচেয়ে বড় মাটির ঘর। দূর থেকে দেখেই মনে হয় এটি একটি ‘মাটির প্রাসাদ’! ইট-পাথরের মাঝে স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে এখনো! একটু সামনে যেতেই পেয়ে গেলাম লয়খত আলী নামের এক বৃদ্ধকে। তার কথায় নিশ্চিত হলাম আমাদের ধারণা ঠিক, এটিই দেশের সবচেয়ে বড় মাটির বাড়ি। লয়খত আলী জানালেন, এই বাড়ি নির্মাণের ইতিহাসের সাক্ষী তিনিও। ১ বছর ধরে এই বাড়ির নির্মাণযজ্ঞ তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। অনেক সময় সাহায্যও করেছেন তিনি। কখনো বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে, কখনো শ্রম দিয়ে। লয়খত আলীকে নিয়েই আমরা ঢুকলাম নওগাঁর ঐতিহ্যবাহী এই বাড়িতে।
৩০ বছর বয়সী এই বাড়িকে প্রথমে দেখেই মনে হলো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এমন বাড়িতে এখনো কেউ বসবাস করে? লয়খত আলী নিজে সেই উত্তর দেননি। ঘর থেকে ঢেকে এনেছেন এক নারীকে। তিনি ফাতেমা বেওয়া। এই বাড়ির গৃহবধূ। জানতে পারলাম, এই বাড়ির নির্মাতা দুই সহোদর সমশের আলী মণ্ডল ও তাহের আলী মণ্ডল। ফাতেমা বেওয়া সমরেশ আলী মণ্ডলের স্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো এই বাড়িতে থাকি। কিন্তু বেশ ভয়ে থাকি সবসময়। ভয়ে থাকলেও এই বাড়িতে থেকে শান্তি আছে!’ কী শান্তির কথা বলছেন ফাতেমা সেটা শোনার আগে আমরা এই বাড়ি নির্মাণের গল্প শোনাতে বললাম।
‘সেসময় তো কে কত বড় বাড়ি বানাবে সেটা নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা ছিল। আর তখন ইট, রড, বালির ঘর ছিল না আমাদের এদিকে। সবাই মাটির ঘর বানাতো। তারা দুই ভাই মিলে এই বিশাল বাড়িটি নির্মাণ করে। বাড়িটি তৈরি করতে সেসময় বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৮০ জন কারিগর লেগেছিল। আর এই বাড়িটি তৈরি করতে যে মাটি লেগেছিল তা বাড়ির পেছনে একটি পুকুর খনন হয়ে যায়। কিন্তু এত বড় বাড়িতে থাকার মতো তখনো কেউ ছিল না। অর্ধেক ঘরই খালি পড়ে থাকতো। আশেপাশের অনেকের আত্মীয়স্বজন এই বাড়িতে শখ করে থাকতো আগে।’—ফাতেমা বেগমের মন্তব্য থামিয়ে লয়খত আলী বলেন, ‘যে বছর এই ঘরটা বানানো হয় সেবছর পুরো গ্রামে খুব বেশি ঘর বানানো হয়নি কারিগরের অভাবে। মাটি, খড় ও পানি দিয়ে ভিজিয়ে কাঁদায় পরিণত করে ২০-৩০ ইঞ্চি চওড়া করে দেয়াল তৈরি করা হয় সেসময়। এ দেয়াল তৈরি করতে বেশ সময় লাগে। কারণ এক সাথে বেশি উঁচু করে মাটির দেয়াল তৈরি করা যায় না। প্রতিবার এক থেকে দেড় ফুট উঁচু করে দেয়াল তৈরি করা হয়। কয়েকদিন পর শুকিয়ে গেলে আবার তার ওপর একই উচ্চতার দেয়াল তৈরি করা হয়। এভাবে দোতলা বাড়িটির ২০-২২ ফুট উঁচু নির্মিত হয়েছে।’

১০৮ কক্ষের মাটির বাড়িটি ২১ বিঘা জমির ওপর নির্মিত। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ২২৫ ফুট। বাড়িতে ছাউনির জন্য টিন লেগেছে ২শ’ বান। মাটির এই বাড়িটি দেখতে অনেকটা প্রাসাদের মতো। এই বাড়িটি তৈরি করতে বাড়ির পেছনে একটি বিশাল পুকুর খনন করতে হয়েছে। যে দোকান থেকে ২শ’ বান টিন কেনা হয়েছিল সেই দোকানদার তাদের একটি চায়না পনেক্স বাইসাইকেল উপহার দেন।
পায়ে হেঁটে একবার বাড়ির চার ধার চক্কর দিতে সময় লাগে ৬-৮ মিনিট। এই বিশাল বাড়িতে প্রবেশের দরজা ১১টি। তবে প্রতিটি রুমে রয়েছে একাধিক দরজা। দোতলায় উঠার সিঁড়ি রয়েছে ১৩টি। তবে যেকোনো একটি দরজা দিয়ে যাওয়া যাবে ১০৮ কক্ষেই। তবে ব্যবহার হয় ৩০টির মতো ঘর। বাড়ির নির্মাতা সমশের আলী মণ্ডল ও তাহের আলী মণ্ডল দুই সহোদর শখের বসে বাড়িটি তৈরি করেছিলেন বলে জানা গেছে। সমশের আলী মণ্ডল এখন বেঁচে না থাকলেও তার পরিবার স্মৃতি হিসেবে এই বাড়িটি এখনো আঁকড়ে রেখেছেন। সমশের আলী মণ্ডলের ছেলে ফারুক হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে বাড়িটিতে থাকেন বড় চাচী ফাতেমা বেওয়া, তার ৪ ছেলে, আমরা দুই ভাই ও স্ত্রী, আর ফুফু মাজেদার ২ ছেলে। এছাড়া তাদের স্বামী-স্ত্রী-সন্তান, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি, আত্মীয়স্বজনসহ মোট ৪০ জন বসবাস করছেন।
গল্প করতে করতে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা। এমনিতেই গ্রাম মানেই সন্ধ্যাতেই নিঝুম নীরবতা। আর মাটির বাড়ি মানেই আরেক রহস্যময় উপাখ্যানের ঝাপি। আলীপুরেই এই বাড়িটিও ঠিক যেন তাই। সন্ধ্যায় মাটির এই বাড়িটি দেখতে অনেকটা ভূতুড়ে প্রাসাদের মতো। আপনি যদি কোনো এক অমাবস্যার রাতে এই বাড়িতে ঘুমাতে যান তাহলে রাজ্যের সব রহস্যময় নিঝুম নীরবতা এসে ভর করবে আপনার ওপরে। শখের বসে অনেকেই বাড়িতে একরাত ঘুমিয়ে সেরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
