ফিনল্যান্ডে ডেটা সেন্টার স্থাপনের জন্য বড় ধরনের বন উজাড় করার ঘটনায় গুগল বর্তমানে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ফিনল্যান্ডের কুহমোস এলাকায় গুগল তাদের নতুন ডেটা সেন্টার প্রকল্পের জন্য প্রায় ৩০০ হেক্টরের বেশি (যা প্রায় ৪২০ থেকে ৫০০টি ফুটবল মাঠের সমান) বনভূমি পরিষ্কার করেছে।
তবে আইন অনুযায়ী বাধ্যতামূলক পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) বা পরিবেশের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই এই বিপুল বনভূমি উজাড় করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে দেশটির তদারকি সংস্থা ফিনিশ সুপারভাইজরি এজেন্সি (এলভিভি)।
গুগলের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা 'তুইকে ফিনল্যান্ড'-এর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ দায়ের করেছে ফিনিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর নেচার কনজারভেশন। সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারপারসন হান্না হালমিনপা বন উজাড় হওয়া প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, 'আমাদের মতে, প্রকল্পটি আইন মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না তা স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত এই নির্মাণক্ষেত্রের সব কার্যক্রম স্থগিত রাখা উচিত।'
তিনি যোগ করেন, 'স্যাটেলাইট চিত্রে আমরা দেখেছি যে যেসব প্রাকৃতিক এলাকা সংরক্ষণ করার কথা ছিল, সেখানেও গাছ কাটা হয়েছে।' কেটে ফেলা বনাঞ্চলের আয়তন প্রায় ৪২০টি ফুটবল মাঠের সমান বলে জানান তিনি।
তবে এক ইমেইল বার্তায় এএফপিকে গুগল দাবি করেছে, 'বন আইনের প্রয়োজনীয়তা মেনেই গাছ কাটার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।' প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তারা এ বিষয়ে এলভিভির পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে।
ফিনল্যান্ডে গুগলের যোগাযোগ ব্যবস্থাপক সন্ড্রে রোনান্ডার বলেন, 'জমি বিন্যাস ও পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আমরা পুরো এলাকায় বিস্তারিত প্রাকৃতিক জরিপ পরিচালনা করেছি, যাতে বন সংক্রান্ত কার্যক্রমের সময় মূল্যবান প্রাকৃতিক অঞ্চলগুলো সুরক্ষিত থাকে।'
ইউরোপে গুগলের একক বৃহত্তম বিনিয়োগ হিসেবে আগামী দুই বছরে ফিনল্যান্ডে ১ হাজার ৩০০ কোটি ইউরো (১৫ বিলিয়ন ডলার) ব্যয়ের যে পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে, বন উজাড়ের এই ঘটনাটি মূলত তারই অংশ।
উত্তর ফিনল্যান্ডের মুহোস পৌরসভায় গুগলের অধিগ্রহণ করা জমিতে মাটিকাটার ভারী যন্ত্র দিয়ে জমি পরিষ্কার করা হচ্ছে এবং প্রধান বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের পাশে নির্মাণ এলাকায় ট্রাকগুলোর অবিরাম আনাগোনা চলছে।
ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে একটি দুগ্ধ খামারের মালিক ৩৬ বছর বয়সী স্থানীয় কৃষক জোনি পিতকানেন। গোয়ালঘরের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, 'প্রকল্পটি এতটাই বিশাল যে, ঠিক পাশেই অবস্থান করার পরও এর ব্যাপকতা পুরোপুরি উপলব্ধি করা কঠিন।'
মুহোস ছাড়াও কাজানি ও ভালা পৌরসভা এবং আগে থেকেই একটি ডেটা সেন্টার চালু থাকা হামিনাতেও কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে গুগল। প্রতিষ্ঠানটির এই বিপুল বৈদেশিক বিনিয়োগ দেখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে এক বার্তায় গুগলকে তাদের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
মাত্র ৮ হাজার ৮০০ জনসংখ্যার মুহোস পৌরসভার বাসিন্দা কৃষক পিতকানেন জানান, এটি স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য আনবে বলে তিনি ইতিবাচক, 'তবে জ্বালানি খরচের প্রভাব কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তা নিয়ে অবশ্যই আমাদের কিছুটা উদ্বেগ রয়েছে।'
মুহোস গ্রাম কেন্দ্রের ছোট কার্যালয়ে বসে পৌর মেয়র কিম্মো হিনো এএফপিকে বলেন, গুগলের এই 'বিশাল বিনিয়োগ' তাকে আজকাল দারুণ ব্যস্ত রেখেছে, কারণ এখানে বর্তমানে 'এই ধরনের কোনো ভারী শিল্প' নেই। মেয়র বলেন, 'এটি পুরো পৌরসভা এবং ওউলু অঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেবে।' তিনি জানান, নির্মাণকাজে অংশ নিতে বিভিন্ন দেশের 'হাজার হাজার শ্রমিক' এখানে আসবেন বলে তিনি আশা করছেন, যাদের আবাসনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবার প্রয়োজন পড়বে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফিনল্যান্ডে ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগের এক বিশাল জোয়ার তৈরি হয়েছে। দেশটির ঠান্ডা জলবায়ু এবং পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, বায়ু ও জলবিদ্যুতের কারণে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, সস্তা ও জীবাশ্ম জ্বালানিমুক্ত বিদ্যুতের পর্যাপ্ত সরবরাহই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করছে। রেকর্ড বেকারত্ব এবং ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে লড়াই করা নর্ডিক এই দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রী পেতেরি অর্পোর ডানপন্থি সরকার ডেটা সেন্টারের মতো প্রকল্পগুলোকে শীর্ষ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
তবে মাইক্রোসফট ও টিকটকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোসহ অন্যান্য সংস্থার তৈরি হতে যাওয়া এসব বিদ্যুৎখেকো ডেটা সেন্টার এখন নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশটির জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা, বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা এবং পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব নিয়ে ফিনল্যান্ডজুড়ে তীব্র জনবিতর্ক শুরু হয়েছে।
ডেটা সেন্টারের অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার এবং পরিবেশ সুরক্ষায় কঠোর বিধিমালার দাবিতে শুরু হওয়া একটি নাগরিক আবেদনে মাত্র তিন দিনেই ৫০ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। বিপুল এই জনসমর্থনের কারণে ফিনিশ কর্তৃপক্ষকে এখন বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচনায় বসতে হবে।
