জাপানের সঙ্গে বিরোধে ১১ বছর ঝুলে আছে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:২০

কম সুদে অর্থায়ন ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে ভারতে প্রথম বুলেট ট্রেন বাস্তবায়নে জাপানের ওপর ভরসা করা হলেও দীর্ঘসূত্রতা ও মতভেদে থমকে আছে প্রকল্পটি। এক দশকেরও বেশি সময় পার হলেও সরঞ্জাম কেনাকাটা ও নীতিগত দ্বন্দ্বে প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে দুই দেশের তীব্র মতভেদ; ফলে এখনো আলোর মুখ দেখেনি মুম্বাই-আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেলপথ।

মহারাষ্ট্রের মুম্বাই থেকে গুজরাটের আহমেদাবাদ পর্যন্ত ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ ভারতের রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের অন্যতম প্রধান উদ্যোগ। ২০১৫ সালে দুই দেশ ৯৮০ বিলিয়ন রুপির (তৎকালীন হিসাবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার) চুক্তিতে সম্মত হয়। জাপান এতে ৫০ বছরের জন্য মাত্র দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

তবে প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ২০২৩ সালে চালু হওয়ার কথা থাকলেও সেই সময় অনেক পিছিয়ে গেছে। জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় কাজ বারবার থেমেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ১ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন রুপিতে (প্রায় ১৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার)।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা জুলাই মাসে এক্সে লিখেছেন, অগ্রগতি না হওয়ার পুরো দায় ভারতীয় পক্ষের। ‘তারা কখনোই নিজেদের প্রতিশ্রুতি রাখে না’এমন মন্তব্যও করেছেন তিনি। জাপানি কর্মকর্তারা অভিযোগ করেছেন, ভারত চুক্তির শর্ত ভেঙে সিগন্যালিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি জার্মান কোম্পানি সিমেন্সকে দিয়েছে। সিমেন্স আন্তর্জাতিক বাজারে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী। জেআর ইস্টের নেতৃত্বে থাকা জাপানি কোম্পানিগুলো এতে হতাশ হয়েছে বলে জানা গেছে।

জাপানের যুক্তি—বুলেট ট্রেনের নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা বজায় রাখতে পুরো ব্যবস্থাটি একীভূত থাকতে হবে। অন্যদিকে জাপানি রেললাইন, ইউরোপীয় সিগন্যালিং আর ভারতীয় ট্রেন মিলিয়ে যে হাইব্রিড ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, তা আগে কোথাও পরীক্ষা করা হয়নি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক জাপানি সূত্র বলেছেন, এটা এখন এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে গেছে যে আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। জেআর ইস্ট অবশ্য এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

উদ্বেগের আরেকটি ইঙ্গিত, টোকিও জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এই প্রকল্প তদারকির জন্য নতুন একটি পদই সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ভারত ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা নিজস্ব উচ্চগতির ট্রেন তৈরি করবে, যা জাপানের কাঙ্ক্ষিত ট্রেনের সমতুল্য সক্ষমতা রাখবে।

রেল মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেছেন, দুই পক্ষই এখন একই অবস্থানে রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা ও সম্মতির পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য রেলব্যবস্থার আধুনিকায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত পুরোনো নেটওয়ার্ককে আধুনিক করার পাশাপাশি মেক ইন ইন্ডিয়া উদ্যোগেরও অংশ এটি। ইতিমধ্যে ভারত তার ব্রড-গেজ রেলপথের ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুতায়িত করেছে, যা অনেক ইউরোপীয় দেশের চেয়েও বেশি। আহমেদাবাদ-মুম্বাই রুটে ইতোমধ্যে ভারতীয় তৈরি সেমি-হাই-স্পিড বন্দে ভারত ট্রেন চলছে।

রেল মন্ত্রণালয় আরও সাতটি উচ্চগতির করিডর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে, মোট দৈর্ঘ্য প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। এতে ১৬ ট্রিলিয়ন রুপি (প্রায় ১৬৭ বিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য রয়েছে। সরকার জানিয়েছে, আগামী গ্রীষ্মে প্রথম পর্যায়ে অন্তত ১০০ কিলোমিটার অংশে ভারতীয় তৈরি ধীরগতির ট্রেন চালু হবে। জাপানি কূটনীতিকরা অবশ্য বলেছেন, প্রথম ধাপ হবে মাত্র ৫০ কিলোমিটার এবং সময়সূচি নিয়েও তাদের সন্দেহ রয়েছে।

প্রযুক্তি ও খরচ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান আলাদা। ভারতীয় আলোচকেরা স্থানীয় উৎপাদন, খরচ কমানো এবং ভবিষ্যতে স্বাধীনতা রাখার সুযোগকে প্রাধান্য দিয়েছেন। জাপান চায় পুরো ব্যবস্থাটিকে একীভূত প্যাকেজ হিসেবে ধরে রাখতে। ভারতীয় পক্ষ মনে করে, জাপানিদের আচরণে এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্বের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে, যা তাদের বিরক্ত করেছে। জাপানি কূটনীতিকরাও স্বীকার করেছেন, দেশটির করপোরেট খাতে বাইরের বিশ্বের প্রতি অন্তর্মুখী মানসিকতা দুই দেশের দূরত্ব বাড়িয়েছে।

এক জ্যেষ্ঠ জাপানি কূটনীতিক বলেছেন, জাপানিরা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং সেগুলো ভালোভাবে বাস্তবায়ন করে। ভারতীয়রা লক্ষ্য অনেক উঁচুতে নির্ধারণ করে, পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করলেও বেশ ভালোভাবেই করে।

রেল মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, প্রকল্পের প্রথম অংশের নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের শুরুতে শেষ হতে পারে। কিন্তু জাপানের পরবর্তী প্রজন্মের ই১০ ট্রেন সরবরাহের সম্ভাব্য সময় ২০৩০-এর দশকের শুরু। ফলে দুই সময়ের মধ্যে বড় ব্যবধান থেকে যাচ্ছে। এই ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩২০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে।

তবে দুই দেশের এই বিরোধ যতই গভীর হোক, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মুখে ভারত-জাপান সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। জুলাই মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন, দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ভাই-বোনের মতো’ আরও ঘনিষ্ঠ করা উচিত। যৌথ বিবৃতিতে জাপান ভারতের আগামী বছর সীমিত পরিসরে উচ্চগতির রেল চালু করার লক্ষ্যকে পুরোপুরি বুঝতে পারছে বলে উল্লেখ করেছে।

ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেছেন, উচ্চগতির রেল প্রকল্পের গতির চেয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতি এখন অনেক বেশি।

 

 

ইত্তেফাক/এবিএস