হঠাৎ করেই ফুটবল দুনিয়ায় এক বিস্ফোরণ ঘটালেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। নেশনস লিগের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনার পর অনেকেই যখন তার অবসরের ঘোষণা দেখার অপেক্ষায় ছিলেন, তখনই ৫ পৃষ্ঠার এক বিশাল চিঠিতে সবকিছুর খোলস ভাঙলেন সিআরসেভেন। ডেনমার্কের ম্যাচের আগে ক্যাম্প ছাড়ার কারণ, কোচের সাথে দ্বন্দ্ব এবং দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি এই পর্তুগিজ অধিনায়ক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন-শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে তাকে যেন কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।
প্রায় ২০০০ শব্দের চিঠিতে রোনালদো লিখেছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের পর পর্তুগালের সমর্থকদের উদ্দেশে একটি চিঠি লিখে তৈরি রেখেছিলাম। আমি এখনো সেটি যত্ন করে রেখে দিয়েছি, যেদিন চিরতরে জাতীয় দলকে বিদায় জানাব, সেদিন এই শব্দগুলোই তাদের সামনে তুলে ধরব।
টুর্নামেন্ট শেষে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার বিমানযাত্রায় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি আমাকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করার তীব্র অনুরোধ জানান। তিনি চান আমি জাতীয় দলে খেলা চালিয়ে যাই। ঠিক পরপরই তিনি আমার কাছে নতুন প্রধান কোচ হিসেবে জর্জে জেসুসকে নিয়ে মতামত জানতে চান। অন্য কোনো সম্ভাব্য কোচের নাম তিনি সে সময় আমাকে প্রকাশ করেননি। আমি সভাপতিকে স্পষ্ট জানিয়েছিলাম। আমার মতে এটিই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হবে।
নতুন প্রধান কোচকে যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো, সেদিন সিদ্ধান্তটিতে আমি সত্যি অনেক আনন্দিত হয়েছিলাম। এটি যে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল, দলের বর্তমান সাফল্যই তার বড় প্রমাণ। এর কয়েক দিন পরই নতুন কোচের পক্ষ থেকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং তিনি সরাসরি দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। আমি তাতে সম্মতি জানাই এবং ছুটি শেষ হওয়ার পর আমাদের সাক্ষাতের দিন ঠিক হয়। সিদাদে দো ফুতবোল-এ, যেখানে আমার ক্লাব প্রাক-মৌসুম ক্যাম্প করছিল, সেখানে আমাদের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
সেদিন কোচ আমাকে বলেছিলেন যে, তিনি তার প্রকল্পে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন এবং আমার উপস্থিতি সেখানে অত্যন্ত জরুরি। ঠিক তখনই তিনি আমার অংশগ্রহণের একটি পরিকল্পনা আমার সামনে তুলে ধরেন। কোচ জানান, আমি প্রথম ও শেষ ম্যাচটিতে খেলব এবং আমার শারীরিকভাবে ফিট রাখার স্বার্থে তিনি প্রতি ম্যাচে তিন থেকে চারটি পরিবর্তন আনবেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি আমার নরওয়ে ও ডেনমার্ক সফরে জাতীয় দলের সঙ্গে না যাওয়ার প্রস্তাব তোলেন। তার পরামর্শ ছিল, আমি যেন প্রথম ম্যাচটি খেলে পর্তুগালেই অবস্থান করি এবং এস্তাদিও দো দ্রাগাও-তে ম্যাচের আগে পুনরায় দলের সঙ্গে যোগ দিই। তবে তার এই প্রস্তাব আমি সঙ্গে সঙ্গেই প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।
আমার কাছে বিষয়টি স্পষ্ট ছিল যে, এটি মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বাইরের দেশে ম্যাচ না খেলা মানেই তো আমি আর দলকে নেতৃত্ব দেব না- এমন হতে পারে না। আমি দেশে থেকে বাড়তি সুবিধা নেব, এটি জাতীয় দলের জন্য কোনো ভালো দৃষ্টান্ত হতে পারে না। অবশেষে কোচও আমার এই যুক্তির সঙ্গে একমত হন।
এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সাক্ষীও ছিলেন এক শীর্ষ কর্মকর্তা উল্লেখ করে রোনালদো আরও বলেন, ‘এই কথোপকথনের সময় আল নাসরের স্পোর্টিং ডিরেক্টর সিমাও কৌতিনিও উপস্থিত ছিলেন- যার কাছে বিগত মৌসুমজুড়ে বর্তমান কোচ নিয়মিত জবাবদিহি করেছেন এবং ২০২৫ সালে ক্লাবে এই কোচের চুক্তির পেছনে তিনি অন্যতম ভূমিকা রেখেছিলেন।
ক্যাম্প শুরু হওয়ার আগের দিন কোচের নিজের অনুরোধেই তিনি লিসবনে আমার বাসায় এসে আরও একটি বৈঠকে বসেন। আলোচনাটি একেবারেই শান্ত পরিবেশে হয়েছিল এবং আগস্ট মাসে যেসব নীতিগত বিষয়ে আমরা সম্মত হয়েছিলাম, তার সবই অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
তবে সবশেষে রোনালদো লিখেছেন, আমার এই কাজের পরিণতি পর্যালোচনা করার এবং যথাযথ শাস্তি দেওয়ার পুরো একচ্ছত্র অধিকার পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই শাস্তির ক্ষেত্রে কোনো শিথিলতা বা সহানুভূতি দেখানো উচিত নয়। কারণ আমি কেবল সাধারণ একজন খেলোয়াড় নই; আমি এই দলের অধিনায়ক। আর সেই কারণে নেতৃত্বের জায়গা থেকে এই ভুলটি আরও বড় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।
নিজের অন্যায়ের কোনো অজুহাত না দিয়ে তিনি আরও বলেন, আমি ইতোপূর্বেই এই ঘটনার জন্য ক্ষমা চেয়েছি। তবে আমি খুব ভালো করেই জানি, যে কোনো কাজের একটা পরিণাম থাকে। আমার মতো যারা দীর্ঘদিন ধরে ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত, তারা প্রত্যেকেই জানেন- মাঠে যার যেমন পদমর্যাদা বা পরিচিতিই থাকুক না কেন, নিয়মের সুযোগ সবার জন্য সমান।
সূত্র: ইএসপিএন
