ট্রাম্পের যে সিদ্ধান্তে বিপাকে ভারতের হাজার হাজার প্রযুক্তি পেশাজীবী

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৫

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার পথ সংকুচিত করলো ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন কর্মীদের চাকরি ও মজুরি সুরক্ষার যুক্তিতে বিশ্বের আটটি বড় প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবা প্রতিষ্ঠানকে গ্রিন কার্ড পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন (পিইআরএম) কর্মসূচি থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। 

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

এমপ্লয়ার-স্পন্সরড গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি ভিসায় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নজরদারি জোরদার এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের এই কর্মসূচিতে অনিয়মের অভিযোগ তোলার পর অ্যাডোবি, কগনিজেন্ট, এইচসিএল এবং ক্যাপজেমিনির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয়েছে।

বড় প্রযুক্তি ও আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানগুলো পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন বা পিইআরএম-কে প্রধান এমপ্লয়ার-স্পন্সরশিপ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। 

মার্কিন সরকার জানিয়েছে, নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়া এই আটটি আইটি কোম্পানির কোনো নতুন পিইআরএম আবেদন গ্রহণ করা হবে না এবং আগের পেন্ডিং থাকা কোনো আবেদনও প্রক্রিয়াজাত করা হবে না।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার মার্কিন শ্রমসচিব কিথ সান্ডারলিং এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও অ্যান্টি-ফ্রড টাস্ক ফোর্সের প্রধান।

প্রশাসনের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠান বিদেশি কর্মী নিয়োগের ভিসাব্যবস্থার অপব্যবহার করে মার্কিন নাগরিকদের চাকরির সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। তবে এ সিদ্ধান্তের অর্থ প্রতিষ্ঠানগুলোর সব ধরনের কাজের ভিসা বাতিল নয়; বরং গ্রিন কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় তাদের আবেদন স্থগিত করা হয়েছে।
 
শ্রম দপ্তরের ঘোষণা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের নতুন কোনো স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন আবেদন গ্রহণ করা হবে না। একইসঙ্গে আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াও স্থগিত থাকবে। সান্ডারলিংয়ের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের আবেদন করেছে। এ সময়ে তারা ২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন এবং ১ লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন পেয়েছে।

স্থায়ী শ্রম সার্টিফিকেশন কর্মসূচি বা পিইআরএমের মাধ্যমে নিয়োগকর্তারা বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার জন্য স্পন্সর করতে পারেন। এ প্রক্রিয়ায় সাধারণত নিয়োগকর্তাকে প্রমাণ করতে হয় যে সংশ্লিষ্ট পদে কাজ করার মতো পর্যাপ্ত যোগ্য মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না।

এই পদক্ষেপে হাজার হাজার ভারতীয় প্রযুক্তি পেশাজীবী ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, তারা এইচ-১বি ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য এমপ্লয়ার-স্পন্সরড গ্রিন কার্ডের ওপর নির্ভর করে থাকেন।

অবশ্য পিইআরএম শ্রম সার্টিফিকেশন কর্মসূচি স্থগিত করা মানেই কোনো কর্মীর এইচ-১বি স্ট্যাটাস বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। তবে এর ফলে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রক্রিয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপে যোগ্য কর্মীদের নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।

মার্কিন সেন্সাস ডাটাভিত্তিক সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা ৫২ লাখের বেশি।

মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে বিশেষভাবে সরব হয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি বিদেশি কর্মী নিয়োগের ভিসাব্যবস্থার সবচেয়ে বেশি অপব্যবহার করেছে। মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করার পর একই ধরনের পদে বিদেশি কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে তাদের প্রতিস্থাপনের অভিযোগও তুলেছেন তিনি।

ভ্যান্সের দাবি, ২০২৫ সালে মাইক্রোসফট প্রায় ৬ হাজার মার্কিন কর্মীকে চাকরিচ্যুত করলেও একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি বিপুলসংখ্যক এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন পেয়েছে এবং হাজার হাজার পিইআরএম আবেদন জমা দিয়েছে। তার অভিযোগ, এসব আবেদনের প্রায় ১ হাজার ছিল ছাঁটাই হওয়া মার্কিন কর্মীদের একই ধরনের পদের বিপরীতে।

মার্কিন শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীদের প্রভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ভ্যান্স এইচ-১বি ভিসায় নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের ‘বিদেশি চুক্তিবদ্ধ চাকর’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে এ ধরনের ভিসা ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘ভিসা মিল’ বলে আক্রমণ করেন তিনি।

ভ্যান্সের ভাষ্য, বিদেশি কর্মী নিয়োগের আগে কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট পদের বিজ্ঞাপন দিয়ে স্থানীয় কর্মীদের সুযোগ দিতে হয়। কিন্তু কিছু প্রতিষ্ঠান ছোট শহরের সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে পরে দাবি করে, যোগ্য কোনো প্রার্থী পাওয়া যায়নি। এভাবে মার্কিন কর্মীদের বাদ দিয়ে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধেও তদন্ত

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহৃত ভিসা কর্মসূচি নিয়েও কঠোর অবস্থান নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। জে-১ বিনিময়-ভিজিটর ভিসার মাধ্যমে বিদেশি গবেষকদের স্পন্সর করা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভ্যান্স।

তার অভিযোগ, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বিদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীদের কাজে লাগিয়ে মার্কিন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী এবং গবেষকদের মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে। এ বিষয়ে হার্ভার্ড, ইয়েল ও স্ট্যানফোর্ডসহ নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।

ভ্যান্সের মতে, দক্ষ ও মেধাবী বিদেশি কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্রে কাজের সুযোগ দেওয়ার জন্য তৈরি ভিসাব্যবস্থা মার্কিন কর্মীদের মজুরি কমানোর হাতিয়ার হতে পারে না। তার দাবি, এ ধরনের চর্চা স্থানীয় কর্মীদের স্বার্থ ও জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

পিইআরএম প্রোগ্রামটি কী
আগের কাগজভিত্তিক ‘এলিয়েন এমপ্লমেন্ট সার্টিফিকেশন’ কর্মসূচির দীর্ঘ প্রক্রিয়াকরণের সময় কমিয়ে আনতে ২০০৫ সালে পিইআরএম চালু করা হয়েছিল। এই কর্মসূচির আওতায় মার্কিন শ্রম বিভাগ নিয়োগকর্তাদের স্থায়ী বাসস্থানের জন্য বিদেশি কর্মীদের স্পন্সর করার অনুমতি দেয়। কোনো ব্যক্তিগত কর্মী নয় বরং যোগ্য মার্কিন নিয়োগকর্তারাই এই প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন।

এই প্রক্রিয়ার জন্য শ্রম বিভাগকে ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস–কে সার্টিফিকেট দিতে হয় যে, নির্দিষ্ট চাকরির সুযোগের জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য ও দক্ষ মার্কিন কর্মী নেই এবং বিদেশি কর্মীকে নিয়োগ দিলে একইভাবে নিযুক্ত আমেরিকানদের মজুরি ও কর্মপরিবেশ প্রভাবিত হবে না।

এটি এইচ-১বি ভিসা থেকে কীভাবে আলাদা

এইচ-১বি হলো একটি অস্থায়ী কাজের ভিসা, যা দক্ষ বিদেশি কর্মীদের সাধারণত ছয় বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার অনুমতি দেয়। অন্যদিকে, পিইআরএম হলো একটি স্থায়ী শ্রম-সংশাপত্র বা সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে বর্তমান এইচ-১বি ভিসা ধারীরা সরাসরি প্রভাবিত হবেন বলে মনে হচ্ছে না।

এই প্রোগ্রামটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
হাজার হাজার ভারতীয় আইটি কর্মীসহ বহু বিদেশি দক্ষ কর্মীর জন্য অস্থায়ী কাজের স্ট্যাটাস থেকে গ্রিন কার্ড পাওয়ার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেতু হলো পিইআরএম প্রোগ্রাম। উন্নত জীবনের সন্ধানে এসব কর্মী যুক্তরাষ্ট্রে যান। অনেক আইটি প্রতিষ্ঠান এই কর্মীদের নিয়োগ করে, যারা সাধারণত অস্থায়ী কাজের ভিসায় (যেমন—এইচ-১বি) কাজ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে বসবাসের চেষ্টা করেন।

পিইআরএম-এর আওতায় নিয়োগকর্তাদের স্পন্সর করার সুযোগ না থাকলে বিদেশি কর্মীরা স্থায়ী বসবাসের একটি মূল পথ হারাতে পারেন এবং তাদের দীর্ঘকাল অস্থায়ী ভিসায় থাকতে বাধ্য হতে হবে।

কোম্পানিগুলোর জন্য বিদেশি প্রতিভা নিয়োগ করা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে, কারণ অনেক প্রবাসী কর্মী স্থায়ী মার্কিন রেসিডেন্সি পাওয়ার পথকেই চাকরি নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রধান কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন।

স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পিইআরএম এবং পারিবারিক মাধ্যমগুলোর বাইরে বিদেশি কর্মীদের কাছে নিজস্ব উদ্যোগে গ্রিন কার্ডের আবেদন করার পথ খোলা থাকে, যেমন—অসাধারণ প্রতিভাধর ব্যক্তিদের জন্য ইবি-১এ বা ইবি-২ ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট ওয়েভার আবেদন। তবে বিশাল ব্যাকলগ এবং বরাদ্দের ঘাটতির কারণে এসব আবেদন প্রক্রিয়াজাত হতে বছর পার হয়ে যেতে পারে।

এই পদক্ষেপটি ভিসার ওপর চলমান কড়াকড়ির পরিধি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, এসব ভিসার কারণে মার্কিনদের চাকরি হারাতে হচ্ছে। নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ ছাড়াই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, কোম্পানিগুলো আমেরিকান কর্মীদের স্থলাভিষিক্ত করতে এবং তাদের মজুরি কমিয়ে দিতে পিইআরএম প্রোগ্রাম ব্যবহার করছে।

ভ্যান্স বলেন, ‘মাইক্রোসফটের প্রতি আমাদের বার্তা হলো- আপনারা একটি বিশাল আমেরিকান কোম্পানি কিন্তু আপনাদের অসাধারণ আমেরিকান কর্মীই নিয়োগ করতে হবে।’

এর আগে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত দক্ষ বিদেশি কর্মীদের নতুন এইচ-১বি ভিসা আবেদনের জন্য এককালীন ১ লাখ ডলার ফি আরোপের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যা পরবর্তীতে ফেডারেল আদালতের আদেশে অবরুদ্ধ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের পর ভারতের প্রযুক্তি খাতের সংগঠন নাসকম জানিয়েছে, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো গত কয়েক বছরে এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।

সংগঠনটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিবাসন এবং দক্ষ কর্মীদের আন্তর্জাতিক চলাচল দুটি আলাদা বিষয়। তাই দুটিকে একইভাবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

নাসকমের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। ভবিষ্যতেও এ কর্মসূচির প্রয়োজন থাকবে।

সংগঠনটি আরও জানিয়েছে, ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয়ভাবে কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে এবং নিজস্ব কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছে। দেশটির ফরচুন ৫০০ তালিকাভুক্ত অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে তারা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে বলে দাবি নাসকমের।

নতুন সিদ্ধান্তে ভারতীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ঠিক কতটা প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে স্থগিতাদেশের বাস্তব প্রয়োগ এবং পরবর্তী সরকারি পদক্ষেপের ওপর।

ইত্তেফাক/এনটিএম