যে জায়গায় শেষবিদায় চেয়েছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকর

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৪০

‘নানা অমর রহে’—অর্থাৎ ‘নানা অমর থাকুন’ স্লোগানে মুখরিত পরিবেশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষবিদায় জানানো হলো ভারতের বর্ষীয়ান অভিনেতা নানা পাটেকারকে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের ডনজে এলাকার একটি খামারবাড়িতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

গতকাল ৭৫ বছর বয়সী এই অভিনেতা গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। 

ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, নিজের খামারবাড়িতেই শেষকৃত্য সম্পন্ন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন নানা পাটেকার। তার সেই ইচ্ছা অনুযায়ী সেখানেই শেষবিদায়ের আয়োজন করা হয়।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় অনুষ্ঠিত শেষকৃত্যে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানানো হয় এই অভিনেতাকে। তার ছেলে মালহার পাটেকর মুখাগ্নি করেন। শেষবারের মতো প্রিয় অভিনেতাকে দেখতে খামারবাড়িতে ভিড় করেন বহু মানুষ।

শেষকৃত্যের সময় পরিবারের সদস্য, চলচ্চিত্রজগতের তারকা এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। অভিনেতার ছেলে মালহার পাটেকার বাবার চিতায় আগুন দেন। বলিউডের পরিচিত মুখ জ্যাকি শ্রফ, সাজিদ নাদিয়াদওয়ালা ও অনিল শর্মাসহ চলচ্চিত্রজগতের অনেকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন। তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও শেষকৃত্যে অংশ নেন।

মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে অভিনেতার শেষকৃত্যে যোগ দিতে তার আদি গ্রামে পৌঁছান। অন্যদিকে, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ মুম্বাইয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে পুনে বিমানবন্দরে নানা পাটেকারের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

গোয়ায় নিজের বাসভবনেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নানা পাটেকার। মৃত্যুর আগের রাত থেকেই তার মাথাব্যথা হচ্ছিল। ওই সময় বাড়িতে তার সঙ্গে ছিলেন ভাতিজা প্রসাদ পাটেকার। পরে অভিনেতাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

মণিপাল হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন। তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সময় ভোর ৫টা ২০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।

অভিনয়ের বাইরে সমাজসেবামূলক কাজেও যুক্ত ছিলেন নানা পাটেকর। বিশেষ করে কৃষকদের সহায়তায় ‘নাম ফাউন্ডেশন’র কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান। অভিনয় ও সমাজসেবায় অবদানের জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রশংসিত এই শিল্পীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন সহকর্মী ও ভক্তরা।

নানা পাটেকারকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষবিদায়

২০২৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল অভিনেতার মৃত্যু প্রসঙ্গ। যে মানুষটি জীবনের কথা বলতেন একেবারে মুখের উপর, মৃত্যুকেও তেমনই সহজভাবে গ্রহণ করেছিলেন। জানিয়েছিলেন, মৃত্যুতে তার বিশ্বাস আছে। জানতেন, একদিন তাকেও চলে যেতে হবে। আর সেই চলে যাওয়ার জন্য তার কাছে প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকাও ছিল খুব ছোট। মাত্র ১২ মণ কাঠ।

সেই সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, শেষযাত্রায় তার প্রয়োজন হবে ১২ মণ কাঠ। সেটাই তার ‘শেষ সম্পত্তি’। এমনকি সেই কাঠ তিনি আগে থেকেই রেখে দিয়েছিলেন নিজের শেষকৃত্যের জন্য। কথাটা এখানেই শেষ করতে পারতেন নানা। কিন্তু তিনি তো নানা পাটেকর। মৃত্যুর মতো ভারী বিষয়কেও নিজের স্বভাবসিদ্ধ রসবোধে হালকা করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিল তার। তাই পরের কথাটাও ছিল অবাক করার মতো। তার অনুরোধ ছিল, শেষকৃত্যের সময় যেন শুকনো কাঠ ব্যবহার করা হয়। ভেজা কাঠ নয়। কারণ ভেজা কাঠে ধোঁয়া হবে। সেই ধোঁয়ায় উপস্থিত মানুষজনের চোখে পানি আসবে। আর তখন একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে যেতে পারে!

নানার ধারণা, ধোঁয়ার কারণে চোখ দিয়ে পানি পড়লে তিনি হয়তো ভুল করে ভাবতে পারেন, তার জন্যই সবাই কাঁদছে। তাই মৃত্যুর সময়ও এমন ভুল বোঝাবুঝি তিনি চান না।

১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নানা পাটেকার অভিনয়ের তীব্রতা, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ধরন এবং জটিল ও প্রচলিত ধারার বাইরে থাকা চরিত্রে অভিনয়ের দক্ষতার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। ‘নাটসম্রাট’, ‘ওয়াজুদ’, ‘পারিন্দা’, ‘আব তক ছাপ্পান’ ও ‘ইয়েশবন্ত’-এর মতো ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

১৯৭৮ সালে ‘গমন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে তার। ২০০০-এর দশকের শুরুতে ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’ (২০০২), ‘আব তক ছাপ্পান’ (২০০৪), ‘অপহরণ’ (২০০৫) এবং ‘ট্যাক্সি নম্বর ৯২১১’ (২০০৬) ছবিতে তার অভিনয় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। গম্ভীর ও জটিল চরিত্রের পাশাপাশি হাস্যরসাত্মক অভিনয়েও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন তিনি।

২০০৭ সালে মুক্তি পাওয়া জনপ্রিয় কমেডি চলচ্চিত্র ‘ওয়েলকাম’-এ গ্যাংস্টার উদয় শেঠির চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক প্রশংসা পান নানা পাটেকার। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটির সিক্যুয়েল ‘ওয়েলকাম ব্যাক’-এও একই চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। দুই ছবিতেই তার অভিনয় দর্শকদের কাছে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়।

২০১৩ সালে চলচ্চিত্র ও শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পাটেকারকে ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মশ্রীতে ভূষিত করা হয়। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি তার দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময় অভিনয়জীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।

মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগেও এই অভিনেতাকে জনসমক্ষে দেখা গিয়েছিল। গোয়ার ডোনা পাউলায় আয়োজিত ‘সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন তিনি। সেই উপস্থিতির কয়েক দিন পরই তার আকস্মিক মৃত্যুতে চলচ্চিত্রজগতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

পর্দায় নানা পাটেকরের শক্তিশালী উপস্থিতি, সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ধরন এবং বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয়ের স্মৃতি এখন তার ভক্তদের মনে। নিজের খামারবাড়িতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষবিদায় নেওয়ার মধ্য দিয়ে পর্দার এই দাপুটে অভিনেতার দীর্ঘ জীবনের ইতি ঘটলো।

ইত্তেফাক/এনটিএম