ইতিহাসে প্রথম

ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত: কী করেছিলেন মেজর নিদাল হাসান?

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:২৪

বিশ্বের আধুনিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মৃত্যুদণ্ড সরাসরি ইন্টারনেটে লাইভস্ট্রিম করে সাধারণ মানুষকে দেখার সুযোগ করে দিতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে কার্যকর হতে যাওয়া এই লাইভ মৃত্যুদণ্ড ঘিরে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও বিতর্ক।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ নিশ্চিত করেছেন, ২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুডে নিজেরই ১৩ জন নিরস্ত্র সহযোদ্ধাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত সাবেক সেনা মেজর ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবার সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। প্রায় এক শতাব্দীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে এটিই প্রথম এমন কোনো দৃশ্যমান জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা হতে চলেছে, যা বিশ্ব রাজনীতি ও আধুনিক বিচারব্যবস্থায় নজিরবিহীন।

প্রতিরক্ষা বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর হতে যাওয়া নিদাল হাসানের এই মৃত্যুদণ্ডের দৃশ্য সরাসরি অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্ববাসী দেখতে পাবে। এ নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ বলেন, এমন জঘন্য অপরাধের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা মানুষের স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন। তিনি আরও জানান, হাসানের জন্য ফায়ারিং স্কোয়াডে সেনা সদস্যরাই উপস্থিত থাকবেন, আর এমনটি হওয়াই উচিত।

হাসান কোনো শেষ ইচ্ছা বা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে কোনো আবেদন জানিয়েছেন কি না জানতে চাইলে সরাসরি তা নাকচ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আমি এগুলোর পরোয়া করি না, আগামী ৩ ডিসেম্বর আমরা তার মুখোমুখি হব।’ পেন্টাগনের মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন যে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই প্রস্তাবে ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

তবে মৃত্যুদণ্ড সরাসরি ইন্টারনেটে সম্প্রচার করার এ সিদ্ধান্তকে আধুনিক যুগে নজিরবিহীন ও আইনি জটিলতায় ভরা বলে আখ্যা দিয়েছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়ে কাজ করা বিশিষ্ট আইনজীবী জন মিলস। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস মারফি সিএনএনকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রকাশ্যে লাইভস্ট্রিম করে এমন মৃত্যুদণ্ড প্রদর্শন অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং এটি আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইসিসের বর্বর কর্মকাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকও এমন পদক্ষেপকে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ফোর্ট হুডের রক্তক্ষয়ী সেই হামলায় সাতটি গুলির আঘাত সহ্য করে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা সাবেক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট আলোনজো লুনসফোর্ড জানান, হাসান যা ঘটিয়েছে তার জন্য ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুই সবচেয়ে ‘উপযুক্ত সাজা’। তবে শিশুদের ওপর এর বিরূপ প্রভাবের কথা ভেবে তিনি উন্মুক্ত লাইভস্ট্রিমের বিষয়ে উদ্বেগ জানান। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, হামলায় নিহত ও বেঁচে ফেরা সেনা সদস্যদের পরিবারের জন্য কোনো ধরনের সেন্সর ছাড়াই এই দৃশ্য দেখার অধিকার থাকা উচিত। লুনসফোর্ড নিজে সেই মৃত্যুদণ্ডের সময় উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা করছেন জানিয়ে বলেন, বুলেটের ট্রিগার টেপার মুহূর্তে তিনি চান হাসান যেন তাঁর চোখের দিকে তাকায় এবং বুঝতে পারে হাসান পরাজিত হয়েছে, তিনি এখনো বেঁচে আছেন।

আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ডেবোরা ডেনো জানান, যুক্তরাষ্ট্রে ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ডে সাধারণ সাক্ষী বা সাংবাদিকদের উপস্থিতির নিয়ম থাকলেও ইন্টারনেটে লাইভস্ট্রিম করার কোনো ইতিহাস নেই। এটি এমন এক চরম স্বচ্ছতা সামনে আনবে যা দেশটিতে আগে কখনো দেখা যায়নি। এতে একদিকে যেমন মৃত্যুদণ্ড সমর্থকরা এর বাস্তব রূপ প্রত্যক্ষ করতে পারবেন, তেমনি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের নীতিমালা লঙ্ঘন ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষার মতো গুরুতর প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জও তৈরি হবে।

অন্যদিকে আইনজীবী জন মিলস মনে করেন, হাসানের আপিল প্রক্রিয়া এখনো সুপ্রিম কোর্ট বা ফেডারেল স্তরে পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং উচ্চ আদালতে গেলে হয়তো স্থগিতাদেশও আসতে পারে। ফলে তিনি এই লাইভস্ট্রিমের উদ্যোগকে ট্রাম্প প্রশাসনের নিছক ‘মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা’ বলে বর্ণনা করেন।

সাবেক এই মার্কিন সেনা মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ২০১৩ সালে সামরিক আদালতে নিজের ভুল স্বীকার করে দাবি করেছিলেন যে, তিনি আফগানিস্তানে তালেবান ও মুসলিমদের রক্ষা করতেই নিজ ঘাঁটির চিকিৎসা ভবনে নিরস্ত্র সহযোদ্ধাদের ওপর গুলি চালিয়েছিলেন। মার্কিন সামরিক আইন অনুযায়ী এমন মৃত্যুদণ্ডে প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত স্বাক্ষর ও উচ্চ আদালতের আপিল পর্যালোচনার প্রয়োজন হয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ১৭টি দেশে ২ হাজার ৭০০-র বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও কেবল ইরান ও আফগানিস্তানেই জনসমক্ষে তা কার্যকর হতে দেখা গেছে। বিশ্বের শীর্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশের তালিকায় চীন, ইরান, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের পরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদের শেষ বছরে ১৭ বছরের বিরতি ভেঙে একযোগে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিলেন এবং পুনরায় ক্ষমতায় এসে জো বাইডেনের দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীতে সর্বশেষ ১৯৬১ সালে এক অস্ট্রিয়ান কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে এক সেনাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার অনুমোদন করেছিলেন। আর ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সর্বশেষ ঘটনা ঘটেছিল ১৯৪৫ সালের জানুয়ারিতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে এক দলত্যাগী সেনাকে গুলির মাধ্যমে। দীর্ঘ আট দশকেরও বেশি সময় পর টেক্সাসের ফোর্ট হুডেই আগামী ৩ ডিসেম্বর মেজর নিদাল হাসানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রথম মার্কিন সামরিক ফায়ারিং স্কোয়াডের এই দণ্ড কার্যকরের দিন ধার্য করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন