আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা এবং বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত আইনজ্ঞ নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। কয়েক দশকের কর্মজীবনে তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে আইনি লড়াই করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে কাজ করেছেন। নারী অধিকার ও লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে তার।
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনামলে ডারবানে এক তামিল পরিবারে জন্ম নেওয়া নাভি পিল্লাই ছোটবেলা থেকেই বর্ণবৈষম্যের বাস্তবতা দেখেছেন। পরবর্তী সময়ে আইনজীবী হিসেবে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকর্মীদের পক্ষে দাঁড়ান তিনি। স্থানীয় পর্যায়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই দিয়ে শুরু হওয়া তার কর্মজীবন পরে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা ও জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থানের জন্য পরিচিত পিল্লাইয়ের উল্লেখযোগ্য অবদানের মধ্যে রয়েছে গণহত্যার ঘটনায় ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন। অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন নাভি পিল্লাই।
কে এই নাভি পিল্লাই
নাভানেথেম পিল্লাইয়ের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন নাটাল প্রদেশের ডারবানের ক্লেয়ারউড এলাকায়। তার বাবা ছিলেন একজন বাসচালক। আট ভাইবোনের পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থায় কৃষ্ণাঙ্গ ও অন্যান্য অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতো।
পিল্লাই নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৬৫ সালে আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৬৭ সালে নাটাল অঞ্চলে নিজস্ব আইনচর্চা শুরু করা প্রথম নারী হিসেবে পরিচিতি পান পিল্লাই। এ সময় বর্ণবাদী সরকারের হাতে আটক রাজনৈতিক কর্মীদের পক্ষে আইনি লড়াই চালান তিনি।
পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন পিল্লাই। ১৯৮২ সালে আইনে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮৮ সালে আইনবিষয়ক উচ্চতর গবেষণার ডিগ্রি অর্জন করেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদবিরোধী কর্মীদের পক্ষে লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তার কর্মজীবন পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
১৯৯৫ সালে রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব নেন নাভি পিল্লাই। ১৯৯৯ সালে তিনি এই ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হন।
রুয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনায় জঁ-পল আকায়েসুর বিচার চলাকালে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৯৮ সালে দেওয়া ওই মামলার রায় আন্তর্জাতিক আইনে গুরুত্বপূর্ণ নজির প্রতিষ্ঠা করে। এতে নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতাকে গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচনার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। পরে ২০০৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার নিযুক্ত হন তিনি। ২০১৪ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে থেকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করেন।
নারী অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠায় অবদান
মানবাধিকার রক্ষার পাশাপাশি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায়ও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন নাভি পিল্লাই। তিনি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইকুয়ালিটি নাউ’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন। সংস্থাটি বিশ্বজুড়ে নারী ও মেয়েশিশুর অধিকার রক্ষা এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূর করতে কাজ করে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ-পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সমতার অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগেও অবদান রয়েছে তার। বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে যেন কেউ বৈষম্যের শিকার না হন, সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে কাজ করেছেন পিল্লাই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকারের সুরক্ষা তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অন্যতম প্রধান দিক।
আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘ পথচলা
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছেছেন নাভি পিল্লাই। রাজনৈতিক বন্দিদের পক্ষে আইনি লড়াই, রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে ভূমিকা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে দায়িত্ব পালন এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে কাজ—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় তার কর্মজীবন উল্লেখযোগ্য।
২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার তার দীর্ঘদিনের এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
