পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের ১২টি জেলায় জরুরি অবস্থা জারির কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। দলটির দাবি, এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর পরিপন্থী হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বলপ্রয়োগের পরিবর্তে আলোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে দলটি।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে দলটির ইসলামাবাদমুখী লংমার্চ কর্মসূচি সপ্তম দিনে গড়িয়েছে। শনিবারও (১০ অক্টোবর) খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে এ কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়া শাখার মুখপাত্র শওকত ইউসুফজাই এক ভিডিও বার্তায় বলেন, প্রদেশের ১২টি জেলায় পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।তিনি ব অলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর গুরুতর লঙ্ঘন হবে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) দীর্ঘদিন ধরে এ সংশোধনীর কৃতিত্ব দাবি করে আসছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণ দেখিয়ে খাইবার পাখতুনখাওয়ার ১২টি জেলায় জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার, এমন খবরের পর ইউসুফজাই এ প্রতিক্রিয়া জানান। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর প্রশাসনিক ও পুলিশি কার্যক্রম কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় সরকার এর আগেও প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা কিংবা গভর্নরের শাসন জারির সম্ভাবনার কথা বলেছে। প্রদেশটির গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডিও প্রয়োজন হলে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তবে পিটিআই শুরু থেকেই এ উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছে। দলটির নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারি করা হলে তাঁরা জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ থেকে পদত্যাগ করতে পারেন।
শওকত ইউসুফজাই বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পিটিআই কখনো বাধা দেয়নি; বরং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতা করেছে। তবে নিরাপত্তাসংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি জানান, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি সর্বদলীয় সম্মেলনে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন অংশীজন ১৫ দফা ঘোষণায় একমত হয়েছেন। এ ঘোষণা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তাঁর মতে, ঘোষণাটি বাস্তবায়ন করা হলে চলমান সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
আগামী ১১ অক্টোবর সোয়াবিতে বড় ধরনের সমাবেশের কথাও জানান পিটিআইয়ের এ নেতা। তার দাবি, সরকার মনে করছে, সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেবে না। তবে প্রস্তাবিত সমাবেশের মাধ্যমে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হবে।
জরুরি অবস্থা কিংবা গভর্নরের শাসন জারি করে সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন ইউসুফজাই। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল ও কর্মীদের ওপর নির্বিচার বলপ্রয়োগ করে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক সমঝোতা ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন।
সরকারের প্রতি জেদ ও অহংকার পরিহার করে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান তিনি। ইউসুফজাইয়ের ভাষ্য, পিটিআইয়ের দাবিগুলো বেআইনি বা অসাংবিধানিক নয়। দলটি আদালতের রায় কার্যকর করা, ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া এবং তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তরের দাবি জানাচ্ছে।
এ ছাড়া ইমরান খানের মামলাগুলোর শুনানি, তার বোন ও স্ত্রীর প্রতিকার এবং মুক্তির বিষয়েও দাবি তুলেছেন ইউসুফজাই। একই সঙ্গে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় প্রাদেশিক মন্ত্রী, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
চলমান রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে এসব গ্রেপ্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করেন পিটিআইয়ের এ মুখপাত্র। তার মতে, সংকট কাটাতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনা ও আন্তরিকতা জরুরি।
পিপিপির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি সম্প্রতি পিটিআইকে সংঘাতের রাজনীতি পরিহার এবং চরমপন্থা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর জবাবে ইউসুফজাই প্রশ্ন তোলেন, নিজেদের ন্যায্য অধিকার কিংবা দলের নেতার পক্ষে কথা বলা কীভাবে চরমপন্থা হতে পারে।
পিটিআইয়ের এ নেতা অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও হুমকিমূলক বক্তব্যের কারণে রাজনৈতিক পরিবেশের অবনতি ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে সমঝোতা ও মধ্যস্থতাকে সংকট উত্তরণের কার্যকর পথ হিসেবে দেখছেন তিনি।
ইউসুফজাই বলেন, মাওলানা ফজলুর রহমান মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে তিনি শুনেছেন। এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, পিটিআইও যেকোনো গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতা প্রক্রিয়ায় ইতিবাচকভাবে সাড়া দেবে।
তার মতে, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দেশের সামনে থাকা সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। সরকার এমন কোনো অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ নেবে না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
এদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, শনিবার ইসলামাবাদে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এতে প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা অংশ নিতে পারেন। বৈঠকে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন পর্যালোচনা এবং প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা বা গভর্নরের শাসন জারির বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় খাইবার পাখতুনখাওয়ার ১২টি জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে আটটি সাবেক উপজাতীয় এলাকা থেকে একীভূত জেলা এবং চারটি পুরোনো প্রশাসনিক কাঠামোর আওতাধীন জেলা।
একীভূত আটটি জেলা হলো খাইবার, কুররম, ওরাকজাই, বাজাউর, মোহমান্দ, উত্তর ওয়াজিরিস্তান, দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান ও লোয়ার ওয়াজিরিস্তান। অন্য চারটি জেলা হচ্ছে ডেরা ইসমাইল খান, ট্যাংক, বান্নু ও লাক্কি মারওয়াত।
সূত্রগুলোর দাবি, এসব জেলার জন্য প্রাদেশিক সরকারের প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রয়েছে। প্রাথমিকভাবে দুই মাসের জন্য এ ব্যবস্থা চালুর কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। পরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এর মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২১তম গ্রেডের একজন সচিবের নেতৃত্বে সচিবালয়টি পরিচালিত হবে। সেখানে একই গ্রেডের একজন পুলিশ কর্মকর্তাকেও দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া প্রশাসন, অর্থ, উন্নয়ন ও পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিভাগ সামলাতে আরও চার থেকে ছয়জন কর্মকর্তা নিয়োগের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।
সূত্রের ভাষ্য, এসব কর্মকর্তা সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে নিয়োগ পেতে পারেন। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোর ডেপুটি কমিশনার, জেলা পুলিশ কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শককে ওই সচিবালয়ের কাছে জবাবদিহি করতে হতে পারে। এ বিষয়ে প্রাদেশিক সরকারকেও অবহিত করা হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রস্তাবিত পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি নির্ধারণে পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ থেকে ২৩৪ অনুচ্ছেদ পর্যালোচনা করা হতে পারে। তবে জরুরি অবস্থা জারি এবং গভর্নরের শাসন প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও আইনি পরিণতি এক নয়। ফলে শেষ পর্যন্ত কোন ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান ও শর্তের ওপর নির্ভর করবে।
সূত্র: দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন
