খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সেনা মোতায়েন, বন্ধ সড়ক ও টেলিযোগাযোগ

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ২১:২৪

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সেনাবাহিনী ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে। প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি হওয়ার পর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের বিভিন্ন সড়কে পণ্যবাহী কনটেইনার বসিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রদেশজুড়ে বড় সংখ্যায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সব ধরনের ল্যান্ডফোন ও টেলিযোগাযোগ সেবাও বন্ধ রাখা হয়েছে।

রোববার (১১ অক্টোবর) দ্য ডন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের আওতায় আগে নেওয়া পদক্ষেপগুলো অনুমোদন করা হয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট হাউসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের পরই জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি হয়।

রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসআরও (১)/২০২৬ জারি করে সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেয়। সরকারি আদেশে বলা হয়, প্রদেশে নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষা এবং সরকারি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তায় সেনাসদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করা হচ্ছে। জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন যত দিন বহাল থাকবে, এই অনুমোদনও তত দিন কার্যকর থাকবে। সংবিধানের ২৪৫ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। রাওয়ালপিন্ডিতে সেনাবাহিনীর জিএইচকিউয়ের সামরিক অভিযান পরিচালনা পরিদপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি প্রয়োজনীয় সেনা ও সরঞ্জামের সংখ্যা নির্ধারণ করবেন।

জরুরি অবস্থা জারির এক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। কেন্দ্রীয় সরকার ও খাইবার পাখতুনখাওয়ার প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করছে পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন)। অন্যদিকে প্রদেশটির সরকার চালাচ্ছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। ইমরান খানের দলটি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বিরোধী দলে রয়েছে। সন্ত্রাসবাদ দমন নীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। এই বিরোধের জেরে গত ৩ অক্টোবর তাদের মধ্যে চলা আলোচনা ভেঙে যায়।

পিটিআই অভিযোগ করেছে, প্রদেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাদের বাইরে রাখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পিটিআই সন্ত্রাসবাদ দমনের নীতি পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে আসছে এবং সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার প্রদেশের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার উদ্যোগ এবং আফগান তালেবানের সঙ্গে সংলাপ নিয়ে প্রাদেশিক সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে আসছে।

জরুরি অবস্থা জারির পর পেশোয়ার শহরের বিভিন্ন স্থানে কনটেইনার বসিয়ে সড়ক বন্ধ করা হয়েছে। পেশোয়ার রেলস্টেশনের কাছে কনটেইনার দিয়ে খাইবার বাজার, শোবা বাজার ও এর বাইরের দিকের পথ বন্ধ করা হয়। এডওয়ার্ডস কলেজের কাছেও কনটেইনার বসানো হয়েছে, যার ফলে জেল রোড ও মালিক সাদ শহীদ ফ্লাইওভারে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বালা হিসার দুর্গের কাছে এবং পিআইএ কার্যালয়ের বাইরেও কনটেইনার রাখা হয়েছে। এতে মল রোডে প্রবেশের পথ বন্ধ রয়েছে। গভর্নর হাউসের আশপাশে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অন্য জেলা থেকেও পুলিশ সদস্য আনা হয়েছে।

গভর্নর হাউস থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে যাওয়ার পথে শুধু সরকারি যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। রয়্যাল আর্টিলারি বাজার বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সদর এলাকার কিছু অংশে চলাচল স্বাভাবিক আছে।

আগে শহরের প্রধান সড়ক খাইবার রোড বন্ধ করায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এই সড়ক জিটি রোডের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি রোডের সংযোগ স্থাপন করেছে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। খাইবার রোড বন্ধ থাকায় বিকল্প সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। এলাকাটি সেনানিবাসের অংশ এবং সেখানে রেড জোনের মধ্যে কোর কমান্ডারের বাসভবন, বেসামরিক সচিবালয়, কেন্দ্রীয় পুলিশ কার্যালয়, মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় ও বাসভবন এবং গভর্নর হাউস রয়েছে।

পেশোয়ারে ল্যান্ডফোন ও ডিএসএলসহ সব ধরনের টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে।

এর আগে শনিবার প্রদেশের পুলিশপ্রধান জুলফিকার হামিদ জরুরি অবস্থা জারি হলে সম্ভাব্য সহিংস বিক্ষোভ ও নাশকতার আশঙ্কায় জেলা পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের কথাও বলেন তিনি।

ইসলামাবাদেও বিরোধী দলগুলোর সংবাদ সম্মেলন আয়োজন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সাধারণত খাইবার পাখতুনখাওয়া হাউসে সংবাদ সম্মেলন হয়। কিন্তু ভবনটি সিলগালা করে দেওয়ায় জোটটি উপযুক্ত স্থান খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়েছে।

এ অবস্থায় তেহরিক-ই-তাহাফুজ-ই-আইন-ই-পাকিস্তান (টিটিএপি) মুরি এক্সপ্রেসওয়ের কাছে ভারা কাহু এলাকায় জামিয়া আল উইলায়ায় সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টিটিএপির মুখপাত্র আখুনজাদা হুসাইন আহমেদ ইউসুফজাই বলেন, প্রথমে কেপি হাউসে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। পরে জানতে পারেন ভবনটি সিলগালা করা হয়েছে। এরপর ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে অনুমতি চাইলে ফি দিতে রাজি থাকা সত্ত্বেও অনুমতি দেওয়া হয়নি। এখন ভারা কাহুতে সংবাদ সম্মেলন করা হবে বলে তিনি জানান।

 

 

ইত্তেফাক/এবিএস