‘আমার ছাত্র-ছাত্রী যখন চিকিৎসক, জজ, পুলিশসহ প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে যায়, তখন গর্বে আমার বুকটা ভরে যায়। একজন শিক্ষকের জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো তার ছাত্রের এই ধরনের অসামান্য সাফল্য। আর প্রকৃত জ্ঞান অর্জনকারী শিক্ষার্থীরা কখনোই শিক্ষককে অসম্মান করতে পারে না। যারা প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করেছে তারা অতীতেও শিক্ষকদের সম্মান করেছে, এখনো করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।’
‘এক টাকার মাস্টার’ লুৎফুর রহমান রোববার (১১ অক্টোবর) ইত্তেফাককে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন লুত্ফর রহমান। তিনি বলেন, ১৯৭০ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুণভড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৪ সালে গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করি। তার বাবার ১০০ বিঘা জমি, ৪ বিঘা জমিতে বসতভিটা ছিল। ১৯৭৪ সালে ব্রহ্মপুত্রের ভয়াবহ ভাঙনে পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। অর্থাভাবে নিজের পড়াশোনা থেমে যায়। পরে তিনি বাগুড়িয়া গ্রামে আশ্রয় নেন। এখানে তিন শতাংশ বসতভিটায় টিনের ঘরে বসবাস করছেন। এই এলাকার কোনো শিশুকে শিক্ষার স্বপ্ন যাতে না থামে সেই চেষ্টা করছেন তিনি। মাত্র এক টাকার বিনিময়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়াচ্ছেন টানা ৫২ বছর। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এক টাকা নেওয়াকে তিনি কখনো আয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। বরং দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত রাখার প্রতীকী ব্যবস্থা হিসেবে এই টাকা নিতেন। দীর্ঘ সময়ে তার কাছে পড়াশোনার হাতেখড়ি নিয়েছে চরের হাজারো শিশু। বর্তমানে তার অনেক সাবেক শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত। কেউ হয়েছেন চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, জজ, পুলিশ কর্মকর্তা কিংবা ব্যাংকার। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষও তার সাবেক শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ জন সাবেক শিক্ষার্থী প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করছেন।
৮০ বছর বয়সেও থেমে নেই লুৎফুর রহমানের শিক্ষাসেবা। পুরোনো একটি সাইকেল নিয়ে এখনো তিনি প্রতিদিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ান। রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়—কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। কখনো খোলা আকাশের নিচে, কখনো চরের বালুর ওপর বসে ৩০ থেকে ৪০ জন শিশুকে একসঙ্গে পাঠদান করেন তিনি। গাইবান্ধা সদর উপজেলার প্রত্যন্ত বাগুরিয়া ও আশপাশের গ্রামে নামমাত্র এক টাকার বিনিময়ে হাজারো শিশুর হাতে তুলে দিয়েছেন শিক্ষার আলো। মানুষের মুখে মুখে তিনি হয়ে ওঠেন ‘এক টাকার মাস্টার’। সেই অসাধারণ শিক্ষাসেবার স্বীকৃতিস্বরূপ গত ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরকারের বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন লুৎফুর রহমান। ৫২ বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়িয়ে আসা মানুষটির হাতে সম্মাননা তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন লুত্ফর রহমান। লুত্ফর রহমানের বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক না হলেও তাকে অবসর ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এ ঘোষণা দেন।
লুত্ফর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা ও উপহার পেয়ে আমি খুব খুশি এবং আনন্দিত। যত দিন বেঁচে থাকব এবং সুস্থ থাকব, আমি শিশুদেরকে পড়িয়ে যাব। আমার জন্য অবসর ভাতা ঘোষণা করায় আমি খুশি। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন। শিক্ষার আলো ছড়ানোর জন্য লুত্ফর রহমান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একাধিক পুরস্কারও পেয়েছেন। ভাইরাল হয়েছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
গাইবান্ধা শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দুরে বাগুড়িয়া গ্রাম। সদর উপজেলার গিদারি ইউনিয়নের অন্তর্গত গ্রামটির ভেতর দিয়ে নির্মিত ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। বাঁধের দুই ধারে নদীভাঙা মানুষের বসবাস। বেশির ভাগ মানুষই দারিদ্রসীমার নিচে বাস করেন। বাঁধের পাশেই লুত্ফর রহমান বসবাস করেন। তিনি বলেন, এখানকার বেশির ভাগ মানুষ নদীভাঙনে নিঃস্ব। একসময় তাদের জমিজমা ছিল। এখন সরকারি জায়গা, বাঁধ ও অন্যের জায়গায় তারা বসবাস করছেন। বেশির ভাগ মানুষ দিনমজুর, জেলে ও রিকশা চালানোর কাজ করেন। তাঁরা যে আয় করেন, তা দিয়ে নিজের সংসারই চলে না। তাই ছেলেমেয়েদের পড়াতেই চান না। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কেন এক টাকা নেন, এমন প্রশ্নে লুত্ফর রহমান বলেছিলেন, ‘বিনা মূল্যে পড়ালে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকে না। তাই আমি এক টাকা ফি নিয়ে পড়াচ্ছি।’ লুত্ফর রহমান বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, গরিব ও অবহেলিত এলাকায় জ্ঞানের আলো ছড়াতে পারছি, এটাই আমার লাভ। দিনমজুর, রিকশাচালকের ছেলেমেয়েরা তো মানুষ হবে। যত দিন সুস্থ থাকব, তত দিন পাঠদান করে যাব।’
লুত্ফর রহমানের ৮০ বছর বয়সেও পাঠদানশক্তি প্রচণ্ড। ৫২ বছর আগে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে দৈনিক দুই মুষ্টি চাল নিয়ে টিউশনি শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে দৈনিক নেন এক টাকা। এখনো এক টাকা ফিতেই পড়াচ্ছেন তিনি। প্রতিদিন সকালে শুরু করেন, চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সাত দফায় প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৬০ জনকে পড়ান। এতে যে অর্থ পান তা দিয়েই তার সংসার চলছে। লুত্ফর রহমান ১৯৭৫ সালে বিয়ে করেন। তার দুই ছেলে, দুই মেয়ে। দুই মেয়ে লিম্মি বেগম ও লিপি বেগমের বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে লাভলু মিয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। ছোট ছেলে মশিউর রহমান একটি কোচিং সেন্টারে চাকরি করেন। বর্তমানে দুই ছেলে, স্ত্রী লতিফুল বেগমকে নিয়ে ছয় সদস্যের সংসার লুত্ফর রহমানের।
