রাজধানীর ধানমন্ডিতে এক তরুণীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগে ফুটপাতে এক ব্যক্তিকে মারধর ও কান ধরে ওঠবস করানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ সময় ঘটনাস্থলে দুই পুলিশ সদস্য উপস্থিত থাকলেও তারা দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন বলে ভিডিওতে দেখা যায়। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত শহীদ আবদুল্লাহ আল মাসুদ রানা (৪৮) নামের ব্যক্তিকে আটক করে এক মাসের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। তবে পুলিশের সামনেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মারধরের ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার দুপুরে ধানমন্ডি সাতমসজিদ সড়কে বাংলাদেশ আই হসপিটালের বিপরীত পাশের ফুটপাতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২ মিনিট ১২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, ক্ষুব্ধ এক যুবক গালিগালাজ করতে করতে ওই ব্যক্তিকে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারছেন এবং কান ধরে ওঠবস করাচ্ছেন। আশপাশের পথচারীদের কাউকে কাউকে ‘মেয়ের গায়ে হাত দিয়েছে’, ‘ক্যানটিনে ঘটনাটি ঘটেছে’ ইত্যাদি মন্তব্য করতে এবং মোবাইল ফোনে দৃশ্যটি ধারণ করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালে মারধরকারী যুবক ও এক পথচারী তার মুঠোফোন নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং আবারও চড় মারেন। এ সময় মাত্র কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পুলিশ সদস্যকে বিষয়টি কেবল প্রত্যক্ষ করতে দেখা যায়।
ভুক্তভোগী ২৩ বছর বয়সী তরুণী জানান, ওই ব্যক্তি তাকে ‘খারাপ স্পর্শ’ করেছিলেন। ঘটনার পর অভিযুক্তকে ধরে কাছে থাকা দুই পুলিশ সদস্যের কাছে নিয়ে গেলে তারা দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ দেখান এবং উল্টো ভুক্তভোগীকে ধানমন্ডি থানায় গিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেন। এ সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের দোষ স্বীকার করে ‘সরি’ বলেন। পরে তরুণী তার মামাকে ফোনে ডেকে আনলে ক্ষুব্ধ মামা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ব্যক্তিকে মারধর করেন। এরপর ধানমন্ডি থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মামুন ভূঁইয়া জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হেফাজতে নেন।
এদিকে পুলিশের উপস্থিতিতে এমন মারধরের ঘটনায় নেটিজেনরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ‘সম্রাট শাহাদত’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত ভিডিওটি ৪৬ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে এবং বহু ব্যবহারকারী এটি শেয়ার করে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আটকের পর অভিযুক্ত শহীদ আবদুল্লাহকে আদালতে হাজির করা হলে ডিএমপির রমনা জোনের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইমরান আহমেদ তাকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ম্যাজিস্ট্রেট জানান, তরুণীকে শ্লীলতাহানির বিষয়টি স্বীকার করায় তাকে এই সাজা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই পুলিশ সদস্যের নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়ে ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম তৈয়ব জানান, সেখানে উপস্থিত জনতার মারমুখী ও উত্তেজিত আচরণের কারণে ওই দুই সদস্য অভিযুক্তকে রক্ষা করতে সাহস পাননি। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে শহীদ আবদুল্লাহকে মারধর করার ঘটনাটি অপরাধ এবং ওই যুবককে পুলিশ খুঁজছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকালে নিষ্ক্রিয় থাকা দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেবে।
ওসি আরও জানান, শহীদ আবদুল্লাহ মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা এবং তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তিনি একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি। এমবিবিএস পড়ার সময় থেকেই তিনি মানসিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। পারিবারিক জীবনে তার বিয়ে হলেও অনেক আগেই তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছেন।
