ডেঙ্গুতে ৬৫ চিকিত্সক ও অর্ধ শতাধিক নার্স আক্রান্ত

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৯, ২২:১৭

দেশের ডাক্তার-নার্সরাই সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু ঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ, এডিস মশার বংশবিস্তারের উত্সস্থলে কাজ করছেন তারা। সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ হাসপাতাল ও এর আশপাশের এলাকা নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর, বাথরুমে পানি জমে থাকে। ওই জমে থাকা  পানিতে ভেসে বেড়ায় এডিস মশার লার্ভা।

আগামী দেড় মাস ডাক্তার-নার্স ও হাসপাতালগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও ঝুঁকির মুখে থাকবেন। অপরদিকে রোগীর স্বজনরাও হাসপাতালে এসে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে-এমন তথ্য রাজধানীর তিনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এ বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৫ জন চিকিত্সক ও অর্ধশতাধিক নার্স। আক্রান্তের মধ্যে ১০ জন ডাক্তার ও একজন নার্স মারা গেছেন। এরমধ্যে ৬ জন চিকিত্সক মারা গেছেন ডিউটি থাকা অবস্থায়। এখনো ১২ জন চিকিত্সক মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এবং মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলালের নেতৃত্বে একটি টিম সারাদেশের হাসপাতালগুলো চিকিত্সকদের কার্যক্রম সরেজমিনে মনিটর এবং উত্সাহ দেওয়ার জন্য কাজ করছে। বর্তমানে এই টিম উত্তরবঙ্গে অবস্থান করছে।

জানা গেছে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৫ জন ডাক্তার ও ৩০ জন নার্স ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।     এছাড়া অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। ডেঙ্গু আক্রান্ত ডাক্তার-নার্সদের বিশ্রামে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার একেএম নাসির উদ্দিন। তবে আক্রান্ত ডাক্তার-নার্সরা জ্বর নিয়েও ডিউটিতে আসছেন। তাদের বক্তব্য, রোগীদের সেবা দিতে পারলেই শান্তি পাই। তাই ঘরে বসে থাকতে পারি না।

বিএমএ মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, হাসপাতালগুলো অবশ্যই পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পরিস্কার রাখাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সারাদেশে হাসপাতালগুলোকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে জনবল সংকটের কারণে এ কাজে বিঘ্ন ঘটছে। কারণ পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজটি প্রতিদিনের। তিনি বলেন, এবার ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিতে সারাদেশে চিকিত্সক-নার্সরা ঐক্যবদ্ধভাবে বিরামহীন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ডাক্তার-নার্সের স্ত্রী/স্বামী, সন্তান ও স্বজনরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। তারপরও তাদের ঘরে রেখে কর্মস্থলে আসছেন চিকিত্সকরা। এটা নজিরবিহীন। এই সত্যতা স্বীকার করেছেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ট, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিএমএ’র মহাসচিব।

এদিকে, এডিস মশা নিধনে তত্পরতা বাড়লেও প্রায় প্রতিদিনই দেড় হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় এক হাজার ৬২৬ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গু নিয়ে উত্কণ্ঠা-উদ্বেগ ও সমালোচনার মধ্যে ঈদের আগেই এডিস মশা নিধনে বিদেশ থেকে নতুন ওষুধ আনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার হয়েছে বলে মনে করছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।

ইতিমধ্যে নতুন করে মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে থাকায় আগস্টের এই ২১ দিনে সারা দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৫৩৪ জন। আর এ বছর এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার ৯৯৫ জন। এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে বিভিন্ন হাসপাতাল ও জেলার চিকিত্সকদের কাছ থেকে অন্তত ১৭৪ জন মারা গেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গতকাল আরো দুই জন মারা গেছেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খাদিজা আকতার (২৭) মারা যান। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) গতকাল বুধবার সকালে মারা গেছেন শাহমুন সিরাজ (১৩) নামে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্র। শাহমুনকে ১৮ তারিখ অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন তাকে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়।

এডিস মশার লার্ভা: ৩ কোম্পানি ও ১০ বাড়ির মালিককে জরিমানা

এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় তিন রিয়েল এস্টেট কোম্পানিকে জরিমানা করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এছাড়া এডিস মশার প্রজনন হতে পারে- এমন পরিবেশ পাওয়ায় ১০ বাড়ির মালিককেও জরমািনা করেছে ডিএসসিসির ভ্রাম্যমাণ আদালত। বুধবার ঢাকা দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করে। বুধবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মোট ২৪১টি বাড়ি ও নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।