এলডিসি উত্তরণ পেছানোর সিদ্ধান্ত এ মাসেই, ২০২৭ সালের মধ্যে ৮-১০ দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির লক্ষ্য: বাণিজ্যমন্ত্রী

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:১৯

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদনের বিষয়ে চলতি মাসেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছে সরকার। একই সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে ৮ থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শেষ করা এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব তথ্য জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই এলডিসি উত্তরণের সময় তিন বছর বাড়ানোর প্রস্তাবের বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে বলে সরকার আশাবাদী। অক্টোবরের শেষ নাগাদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

মন্ত্রী জানান, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিতে বাংলাদেশের আরও সময় প্রয়োজন। এ কারণে সরকার ইতোমধ্যে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে।

তিনি বলেন, 'তিন বছর সময় বাড়ানোর বিষয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আমাদের ব্যাপকভাবে ঐকমত্য হয়েছে। আমি খুবই আশাবাদী, আগামী সপ্তাহে কিংবা তার পরের সপ্তাহে, অর্থাৎ অক্টোবরের মধ্যেই এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে।'

ঢাকায় বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের পথপরিক্রমা: গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত বিকল্প অনুসন্ধান’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তিনি আরও জানান, প্রস্তাবিত অতিরিক্ত তিন বছর কাজে লাগিয়ে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি জোরদার করতে সরকার সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। পরিকল্পনাটি ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে।

এলডিসি উত্তরণে বাড়তি সময় চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মন্ত্রী বলেন, 'আমরা ইতোমধ্যে অনেক সময় নষ্ট করেছি। এলডিসি উত্তরণের ফলে যে অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে, সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে আমরা বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে গৌরবান্বিত করার চেষ্টা করেছি।'

২০২৭ সালের মধ্যে ৮-১০ দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শেষের লক্ষ্য

এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। উত্তরণের পর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য নির্ধারিত বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়া বা প্রত্যাহারের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখাই এ উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ১০টি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

ওমান, সিঙ্গাপুর ও নিউজিল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা বা প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষর করেছে।

তিনি বলেন, 'বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাজার সুবিধা ধরে রাখতে এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই ইইউর সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) চূড়ান্ত করতে চায় সরকার।'

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্যদেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা পরিচালনার জন্য সরকার একজন প্রধান আলোচক নিয়োগ দিয়েছে। প্রথম দফার কারিগরি আলোচনা শুরুর প্রস্তুতিও চলছে। তবে আলোচনার তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, 'আমি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি সদস্যদেশের মন্ত্রী, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত এবং ইউরোপীয় বাণিজ্য কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছি। এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করতে পারব বলে আমি আশাবাদী।'

তিনি আরও বলেন, 'ইইউর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি বাংলাদেশ জেনারেলাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস (জিএসপি প্লাস) সুবিধা পাওয়ার চেষ্টাও চালিয়ে যাবে। তবে এ সুবিধার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন হওয়ার আগেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন হবে বলে সরকার আশা করছে।'

এদিকে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহৎ বাণিজ্য জোট রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগদানের প্রক্রিয়া শুরুর নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে বাংলাদেশ।

মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও আরও একটি দেশের আরসিইপিতে যোগদানের প্রক্রিয়া তদারকির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সরকারের লক্ষ্য, এলডিসি থেকে উত্তরণের আগেই আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার বাড়ানো। এর মাধ্যমে রপ্তানির গতি ধরে রাখা, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে আরও সহজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে চায় সরকার।

পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় উত্তরণ পেছানোর আবেদন

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারেনি। এ কারণেই প্রস্তুতির জন্য আরও সময় প্রয়োজন।

তিনি জ্বালানি নিরাপত্তার দুর্বলতা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুতের অভাব এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী বলেন, 'বাংলাদেশ এখনো আমদানি করা গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে, পর্যাপ্ত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে কিংবা দাম ওঠানামা করলে দেশকে ঝুঁকিতে পড়তে হয়।'

তিনি আরও বলেন, 'সয়াবিন তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসসহ (এলপিজি) নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত কৌশলগত মজুতও দেশে নেই। ফলে সরবরাহে আকস্মিক সংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে।'

বাণিজ্যমন্ত্রীর মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং ক্রমবর্ধমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে বাংলাদেশে আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

মন্ত্রীর হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ কর্মক্ষম বয়সে পৌঁছাতে পারে। ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়ছে।

ইত্তেফাক/এসজে