মনীষী

আমাদের প্রিয় শিক্ষক

আপডেট : ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:০৩

 

আমাদের অধিকাংশ লেখকের মতো সাহিত্য তাঁর কাছে কেবল ব্যক্তিগত উপভোগ বা একান্ত চর্চার ব্যাপার ছিল না। একে তিনি দেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে। তাই সাহিত্যবোদ্ধার বা লেখক-সত্তার পাশাপাশি তাঁর ভেতর সহজেই দেখতে পাই একজন সাহিত্যকর্মী ও সাহিত্য-সংগঠকের হূদয়। নিজের উদ্যোগে পঞ্চাশ দশকে বাংলা সাহিত্যের ওপর সেমিনার-ক্রম আয়োজন বা রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকীর সাফল্যে তাঁর সেই যোগ্যতার প্রমাণ মেলে। এর শেষ প্রমাণ রয়েছে নব্বইয়ের দশকে এশিয়াটিক সোসাইটিতে বাংলা সাহিত্যের মূল্যায়নের ওপর আর একবার তাঁর বড়ো ধরনের সেমিনার-ক্রম আয়োজনে। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি ও অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ বা সারা জীবন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যোগ্যতার সঙ্গে পালনেও এর পরিচয় আছে। তাঁর সাহিত্য-দায়িত্বের সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ তাঁর সম্পাদিত অভিজাত রুচির ইংরেজি পত্রিকা ‘নিউ ভ্যালিউজ’ (১৯৪৯-১৯৬৫)। এই পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর ইংরেজি লেখাগুলোও তাঁর সাহিত্য-প্রতিভার প্রমাণ।

সুদর্শন, সুচারুভাষী ড. মুরশিদ আজীবন আমাদের সামনে ছিলেন অভিজাত মূল্যবোধ, উদারতা, পরিশীলন, মার্জিত রুচি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতীক। তাঁর সসম্ভ্রম ব্যক্তিত্ব, মর্যাদাবোধ ও সাহিত্যপ্রেম সবসময় আমাদের ভেতরে শ্রেয়ের স্বপ্ন জাগিয়ে রাখতে সাহায্য করেছে; আশার প্রতীক হয়ে শক্তি বাড়িয়েছে। ঊনবিংশ শতকের বাঙালি জীবনে যে রেনেসাঁস জেগেছিল তা ইউরোপের মতো প্রাচীন গ্রিসের প্রেরণায় বিকশিত হয়নি। বাঙালির হাতে এ এসেছিল রেনেসাঁ-জাগ্রত ইংল্যান্ডের হাত ধরে। ইংল্যান্ড আর আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়ে সেকালে এদেশে জন্ম নিয়েছিলেন এমন কিছু মানুষ যাঁরা উদারতায়, মহিমায়, মনুষ্যত্বে, ব্যক্তিত্বের বহুচ্ছরণে ছিলেন ইউরোপীয় ‘রেনেসাঁ-মানব’দের সমকক্ষ। উনিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাঙালিদের ভেতর জন্ম নিয়েছেন এমনি বহু সম্পন্ন মানুষ যাঁরা তাঁদের অন্তর্লোকের আলোয় সমাজ এবং পরিপার্শ্বকে কমবেশি দীপিত করেছেন। রেনেসাঁ-মানবের ঐ গুণাবলি নিয়ে আমাদের সমাজে জন্ম নেওয়া শেষ গুটিকয় মানুষের মধ্যে ড. মুরশিদ একজন। প্রতিভার অবিস্মরণীয় উদ্ভাসে চারপাশকে তিনি বিচ্ছুরিত করেছেন—তাঁর সম্বন্ধে এমন কথা অত জোর দিয়ে বলব না কিন্তু তাঁর সুষম সুমার্জিত ব্যক্তিত্ব, শ্রেয়োবোধ, পরিশীলিত ও উচ্চায়ত বৈদগ্ধ্য দিয়ে আমাদের সামনে উন্নত জীবনের যে-মানদণ্ড তিনি আজীবন উঁচু করে রেখেছিলেন তার মূল্য অস্বীকার করলে কৃতঘ্নতা হবে।   (শেষাংশ)

সূত্র: খান সারওয়ার মুরশিদ সংবর্ধনা-গ্রন্থ (বাংলা একাডেমি, ২০১২)