নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর আবার ইরানে বড় হামলার ছক

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৩৫

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মজুত এবং জ্বালানি অবকাঠামো। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত এ হামলার অনুমোদন দেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বুধবার (২১ অক্টোবর) মার্কিন কর্মকর্তা ও সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্বল্প সময়ের মধ্যে ইরানে ব্যাপক ও তীব্র হামলা চালানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এ সপ্তাহে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

তবে নতুন করে হামলা হলে কঠোর পাল্টা জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য সংঘাত শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে দেওয়া হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারী ইরানে টানা তিন দিন ব্যাপক হামলা চালানোর কথা বিবেচনা করছেন। তাদের ধারণা, দেশটির অর্থনীতি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে পারলে তেহরান আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে।

তবে এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যৌথ হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল ইরানের সরকার পরিবর্তন। কিন্তু প্রায় আট মাসের সংঘাতের পরও দেশটির সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ অবরোধের মধ্যেও তেহরান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।

How would a Netanyahu election loss change Israel's policies ...

নির্বাচনের হিসাব ও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, চলতি বছর একাধিকবার ইরানে বড় হামলার প্রস্তাব অনুমোদন না দিয়ে আটকে দিয়েছেন ট্রাম্প। অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বাহিনী অভিযানের প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করলেও শেষ মুহূর্তে তিনি তা স্থগিত করেন।

নভেম্বরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার হওয়ার কথা রয়েছে। এ সময় তিনটি বিমানবাহী রণতরি, হাজারো মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান ও বিশেষ বাহিনীসহ পূর্ণাঙ্গ সামরিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হতে পারে।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও সম্ভাব্য হামলার সময় নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনে নেতানিয়াহু পরাজিত হলে নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তাকে তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকতে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানে হামলার আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে বিরোধীদের নিয়ে জরুরি ঐক্য সরকার গঠনের উদ্যোগ নিতে পারেন নেতানিয়াহু—এমন ধারণা কিছু বিশ্লেষকের। ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাজাল মুয়ালেম বলেন, নেতানিয়াহু এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ঐক্য সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের গভীর সন্দেহের মুখে পড়তে হবে তাকে।

সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ও পাল্টা হামলার আশঙ্কা
সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো। এর মধ্যে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত ‘পিক্যাক্স’ কেন্দ্রও রয়েছে। সেখানে হামলার জন্য ২২ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন ট্রাম্প বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমির ওপর বিস্ফোরিত হওয়া এ ধরনের বোমা দিয়ে ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে।

ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছে। তবে তেল শোধনাগারে হামলা চালালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশ এ ধরনের লক্ষ্যবস্তু এড়িয়ে চলার পক্ষে।

অন্যদিকে, নতুন করে হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ, জ্বালানি স্থাপনা, ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে ইরানের কর্মকর্তারা। এর ফলে সংঘাতের প্রভাব সামরিক স্থাপনার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এদিকে, হুতিদের হামলার আশঙ্কায় গত বুধবার সৌদি আরব থেকে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন—এমন মার্কিন সরকারি কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন।

তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক পেইমান সালেহির মতে, জ্বালানির দাম বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করা ইরানের জন্য কার্যকর কৌশল হতে পারে। তিনি বলেন, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, তেল ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি মার্কিন জনগণকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং এর মাধ্যমে ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করা সম্ভব।

কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি নয় ইরান। তেহরান চায়, প্রথমে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি সমঝোতা হোক। এরপর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হবে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই পারমাণবিক ইস্যুকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চায়।

সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ডানা স্ট্রাউল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যখন অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত বাড়ছে, তখন নতুন করে যুদ্ধ শুরু করলে পরিস্থিতির কী উন্নতি হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু কেউই বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

ইরানের আলোচক দলের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদিও তিন দিনের মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনাকে অবাস্তব বলে মনে করেন। তার হুঁশিয়ারি, নতুন হামলা হলে ইরানের পাল্টা আক্রমণ হবে আরও তীব্র, সৃজনশীল ও ভিন্ন ধরনের।

ইত্তেফাক/এসজেএস