ইন্ডিয়া এম্পায়ারের নিবন্ধ

হাত মেলানোর অপেক্ষায় বাংলাদেশ-ভারত

আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৩৬

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একটি বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী নভেম্বর মাসে এ সফর হতে পারে বলে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি চূড়ান্ত হয়নি। দুই দেশের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, সফরের জন্য উপযুক্ত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠক কেবল আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস, বাণিজ্য ও দীর্ঘ সীমান্তে আবদ্ধ দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস কাটিয়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে সম্পর্কের প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করবে আনুষ্ঠানিক বৈঠকের বাইরেও দুই সরকার কতটা কার্যকর আলোচনা, সমঝোতা ও বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারে, তার ওপর।

নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় 

দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যের লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বড় পরিবর্তন আসে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই দেশে ফেরেন তিনি।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক আবেগের সৃষ্টি করে। বাবা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা।

তবে তারেক রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার যেমন শক্তিশালী, তেমনি তা নানা বিতর্ক ও চ্যালেঞ্জেও পরিপূর্ণ। নির্বাসনে থাকার সময় তার রাজনৈতিক ভূমিকা, অতীতের অভিযোগ এবং পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে দেশে-বিদেশে নানা আলোচনা হয়েছে।

দেশে ফেরার পরপরই তাকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনগণের প্রত্যাশার মধ্যে দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। এর মধ্যেই দেশে ফেরার কয়েক দিনের মাথায় মারা যান বেগম খালেদা জিয়া। তার জানাজায় ঢাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে এবং বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

এরপর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পায় বিএনপি। ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম নাটকীয় ক্ষমতার পালাবদল সম্পন্ন হয়।

এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক বিভাজন কমানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতি ও জনজীবনের সংকট মোকাবিলা করা।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারতের কূটনৈতিক বার্তা

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রাথমিক ইঙ্গিত আসে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর। তার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পাঠানো শোকবার্তা তার হাতে তুলে দেন। জয়শঙ্কর আশা প্রকাশ করেন, খালেদা জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

এখানে দুটি কূটনৈতিক উদ্যোগের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। অন্যদিকে, জয়শঙ্কর ঢাকায় গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তি বাড়ায়। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নিরাপত্তা, রাজনৈতিক বক্তব্য ও দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাশা নিয়েও মতপার্থক্য দেখা দেয়।

নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের পর প্রধানমন্ত্রী মোদি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং টেলিফোনে কথা বলেন। এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকবে।’

দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক জোরদার এবং অভিন্ন উন্নয়ন লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহও প্রকাশ করেন মোদি।

কূটনৈতিকভাবে এই বার্তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এতে দুই দেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান হয়ে গেছে—এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। বরং পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার একটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তারেক রহমান সরকারের প্রতি আগ্রহ

বিএনপির নির্বাচনী বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিএনপি ও তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে আঞ্চলিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা এগিয়ে নিতে নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। চীনও নির্বাচনের ফলকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতার প্রস্তুতির কথা জানায়।

বাংলাদেশের জন্য এই আন্তর্জাতিক মনোযোগ একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেশটির প্রয়োজন বিদেশি বিনিয়োগ, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। একই সঙ্গে কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাও জরুরি।

নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং একক কোনো শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়ানোর কথা বলেছেন। বিএনপির ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গে এই অবস্থানের সামঞ্জস্য রয়েছে।

তবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য রক্ষার প্রচেষ্টা ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—সব পক্ষই নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ভৌগোলিক নৈকট্য ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে গুরুত্বপূর্ণ করে তুললেও তা রাজনৈতিকভাবে সব বিষয়ে একমত থাকার নিশ্চয়তা দেয় না।

দুই দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার

বাংলাদেশে ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগকে দুই দেশের সম্পর্কের প্রতি নয়াদিল্লির বাড়তি মনোযোগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নয়াদিল্লিতে পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্মতি পাওয়ার খবরও এসেছে। তিনি এম রিয়াজ হামিদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হবেন। রিয়াজ হামিদুল্লাহ জেনেভায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন।

একজন কর্মরত পররাষ্ট্রসচিবকে ভারতের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্তকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনা ও অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

তবে নিয়োগের খবর প্রকাশিত হলেও ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত আসাদ আলম সিয়ামের আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের সময় নিশ্চিত হয়নি।

দিল্লি সফরের সম্ভাবনা নিয়ে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য ভারতের আমন্ত্রণ খোলা রয়েছে এবং সফর নিয়ে তাড়াহুড়োর প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও জানিয়েছেন, এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে সফরের জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও অনুকূল পরিবেশ থাকা প্রয়োজন।

এই বক্তব্যগুলো ইঙ্গিত দেয়, দুই দেশই প্রস্তুতিহীন কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে একটি কার্যকর ভিত্তি তৈরি করতে আগ্রহী। কারণ, তাড়াহুড়ো করে বৈঠক আয়োজন করলে সংবাদ শিরোনাম তৈরি হতে পারে, কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুলে দিতে পারে।

নির্বাচনী ম্যান্ডেটের সঙ্গে বাড়তি দায়িত্ব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছেন। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে নিম্নআয়ের পরিবারকে সহায়তা, কৃষকের কল্যাণ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। এখন এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা।

বাংলাদেশকে তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রতিহিংসা ও সংঘাতের নতুন চক্রের পরিবর্তে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার প্রমাণ দিতে হবে।

নির্বাচনের আগে টাইমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান জাতীয় ঐক্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা যদি দেশকে ঐক্যবদ্ধ করতে না পারি, তাহলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।’

তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকেও দূরে থাকার কথা বলেছেন। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এসব বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। অতীতের দমন-পীড়ন, কারাবরণ, সহিংসতা ও রাজনৈতিক বঞ্চনার স্মৃতি এখনো অনেকের মধ্যে তাজা।

তাই নতুন সরকারের সামনে বড় পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিরোধীদের শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দেওয়া। নির্বাচনে জয় সরকারকে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা দেয়, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে জনগণের সব অংশের প্রতি জবাবদিহির দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়।

ভারতের জন্যও একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তের ওপারে রাজনৈতিক অস্থিরতা দুই দেশের বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও জনগণের পারস্পরিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে। শুধু ক্ষমতাসীন নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয় না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, স্বচ্ছ চুক্তি ও নিয়মিত যোগাযোগ সম্পর্ককে বেশি টেকসই করে।

তিস্তা, সীমান্ত ও শেখ হাসিনা: আলোচনার কঠিন বিষয়

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, যোগাযোগব্যবস্থা, ভিসা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ।

বাংলাদেশের জন্য তিস্তার পানিবণ্টন দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। অন্যদিকে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে।

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানও দুই দেশের সম্পর্কে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু। বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রেক্ষাপট নিয়ে বিতর্ক থাকায় বিষয়টি ঢাকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নয়াদিল্লির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক—উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই ইস্যুগুলো এড়িয়ে গিয়ে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করলে তা সাময়িক হতে পারে। বরং পারস্পরিক উদ্বেগ স্বীকার করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।

ভারতকে বাংলাদেশের পানি, বাণিজ্য ও বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থায় সুবিধার ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। একইভাবে, বাংলাদেশকেও ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।

কোনো পক্ষই সব দাবি পূরণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তবে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ও যাচাইযোগ্য সমাধান বের করা দুই দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের বার্তা

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা দিতে দুর্গাপূজার অনুষ্ঠানে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

২০ অক্টোবর রংপুরের রাধাগোবিন্দ ধর্মসভা মন্দিরে শারদীয় শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকারভুক্ত দেশ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের ঐক্যের কথাও স্মরণ করেন তিনি।

তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে জাতীয় ঐক্য ও ধর্মীয় সম্প্রীতির পক্ষে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, সমান নাগরিক অধিকার এবং আইনের সমান প্রয়োগ বাস্তবে কতটা নিশ্চিত হয়, তার ওপরই এ উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা বাড়াতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষার বিষয়টি নিয়মিত আলোচনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।

ছবি তোলার বাইরে বাস্তব সহযোগিতার পরীক্ষা

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে উঠলে দুই দেশই বিভিন্ন ক্ষেত্রে লাভবান হতে পারে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবসার ব্যয় কমাতে এবং আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ সহজ করতে পারে। জ্বালানি সহযোগিতা শিল্প ও গৃহস্থালি পর্যায়ে স্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে।

একইভাবে, সহজ ও পূর্বানুমানযোগ্য ভিসাব্যবস্থা শিক্ষার্থী, রোগী, পর্যটক এবং ব্যবসায়ীদের যাতায়াত সহজ করবে। বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে সমাধান করা সম্ভব।

তবে এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সুবিধার ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক কোনো একতরফা প্রত্যাশার ওপর দাঁড়াতে পারে না। উভয় দেশের স্বার্থ, উদ্বেগ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

শেখ হাসিনার সময়কার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর বর্তমান বাস্তবতা এক নয়। তাই সম্পর্ক পুনর্গঠনের অর্থ অতীতের ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা হওয়া উচিত নয়। বরং বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্বীকৃতি দিয়ে ভারতের বৈধ নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

এর জন্য প্রয়োজন বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি, ধৈর্য এবং মতপার্থক্যকে শত্রুতায় পরিণত না করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

সফর চূড়ান্ত নয়, তবে সম্ভাবনা রয়েছে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। সফরটি নভেম্বরে হতে পারে, আবার প্রস্তুতির প্রয়োজনে আরও সময়ও লাগতে পারে।

যতক্ষণ না দুই সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তারিখ ঘোষণা করছে, ততক্ষণ সফরটিকে চূড়ান্ত না বলে আলোচনাধীন হিসেবে বিবেচনা করাই যথাযথ।

দিল্লিতে দুই নেতার সম্ভাব্য করমর্দন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মুহূর্ত হতে পারে। তবে সেটিই সম্পর্কের সাফল্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়।

প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এরপর কী ঘটে—দুই দেশ শুভেচ্ছাকে কার্যকর চুক্তিতে, মতবিরোধকে সংলাপে এবং ভৌগোলিক নৈকট্যকে জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানো একটি টেকসই সম্পর্কে রূপ দিতে পারে কি না, তার ওপর।

বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে নতুন করে আস্থা গড়ে তোলার। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তব অগ্রগতি, পারস্পরিক সম্মান এবং দুই দেশের মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সদিচ্ছা।

ইত্তেফাক/এএম