ফিফার গোলকধাঁধায় এক ম্যাচ খেলেই জাতীয় দলের স্বপ্ন শেষ ইউরোপসেরা কিপারের

আপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৪

বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে জন্ম, সেখানেই বেড়ে ওঠা, যুব পর্যায়ে দেশের জার্সিতে ২৬টি ম্যাচ—অথচ সিনিয়র দলে সুযোগ মেলেনি। থিবো কোর্তোয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বসে না থেকে ২২ বছর বয়সে বাবার দেশ সার্বিয়ার প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন মিলে সভিলার। কিন্তু ফিফার 'ওয়ান-ওয়ে রুল' নামের এক নিষ্ঠুর বিধি তাকে এমন এক গোলকধাঁধায় আটকে রেখেছে, যেখানে সার্বিয়ায় মন বসছে না, অথচ বেলজিয়ামে ফেরার সব পথ চিরতরে রুদ্ধ।

২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর। হাঙ্গেরির দেব্রেচেনে নিরপেক্ষ ভেন্যুতে কাতারের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে নামে সার্বিয়া। বিরতির সময় প্রেদ্রাগ রাইকোভিচের বদলে মাঠে নামেন ২২ বছরের তরুণ গোলকিপার সভিলার। সার্বিয়ার জার্সিতে তার অভিষেক। ম্যাচটি ৪-০ গোলে জেতে সার্বিয়া। কিন্তু সভিলারের জীবনে সেটি হয়ে ওঠে স্থায়ী এক বিভীষিকা।

ওই একটি ম্যাচের পর বিশ্বকাপ বাছাইয়ের আরও চার ম্যাচের স্কোয়াডে ছিলেন তিনি, তবে মাঠে নামার সুযোগ পাননি একটিতেও। ২৭ বছর বয়সে এসে সার্বিয়ার হয়ে তার আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা ওই একটিই। অথচ গত মৌসুমে সিরি 'আ'-র সেরা গোলকিপারের পুরস্কার উঠেছে তার হাতে। রোমার জার্সিতে তিনি এখন ইউরোপের শীর্ষ কিপারদের অন্যতম।

সভিলারের ফুটবলযাত্রা শুরু বাবা রাতকো সভিলারের হাত ধরে। সাবেক যুগোস্লাভিয়া জাতীয় দলের গোলকিপার রাতকো ৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন। রয়্যাল অ্যান্টওয়ার্পের গোলবার ১৬ বছর আগলে রেখে ১৯৯৬ সালে বুটজোড়া তুলে রাখেন। ১৯৯৯ সালের আগস্টে অ্যান্টওয়ার্পে জন্ম নেওয়া ছেলে মিলে ১০ বছর বয়সে বেয়ারশট থেকে পাড়ি জমান ব্রাসেলসের আন্ডারলেখটে। বেলজিয়ামের অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে শুরু করে প্রতিটি যুব দলে খেলেন। ২০১৬ সালের ইউরোপীয় অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে নজরকাড়া পারফরম্যান্সের পর ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে যোগ দেন বেনফিকায়। সেখানেই সিনিয়র দলে অভিষেক।

সেই সময় উয়েফা ডটকমকে তিনি বলেছিলেন, 'বাবার কাছ থেকে প্রায় সবকিছুই শিখেছি। আমার খেলার ধরনও তার মতো।'

বাবার মতো খেলার টানেই সম্ভবত বাবার দেশকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত। কিন্তু সেখানেও অপেক্ষা করছিল হতাশা। রাইকোভিচ তখন এক নম্বর, তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত ভানিয়া মিলিঙ্কোভিচ-সাভিচ। পরবর্তী বছরগুলোয় এই দুজনকেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলিয়েছে সার্বিয়া। ফেডারেশন বদলের এত ঝক্কি সত্ত্বেও মূল গোলকিপারের জায়গা পাননি সভিলার।

এরপর তিনি ফিরতে চেয়েছিলেন বেলজিয়ামে। কিন্তু ফিফার 'ওয়ান-ওয়ে রুল' দেয়াল তুলে দাঁড়ায়। এই বিধি অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় ফেডারেশন বদলে নতুন দেশের হয়ে সিনিয়র পর্যায়ে একটি মাত্র ম্যাচ খেললেও—তা প্রস্তুতি ম্যাচ হোক বা প্রতিযোগিতামূলক—আগের দেশে আর ফেরা সম্ভব নয়। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারের বিপক্ষে ওই অর্ধেক ম্যাচই সভিলারের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে।

২০২২ সালে বেনফিকা ছেড়ে ইতালিতে আসার পর থেকে বছরের পর বছর ফিফার কাছে ছাড় চেয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালের বসন্তে বেলজিয়ামের তৎকালীন কোচ দোমেনিকো তেদেস্কো নিশ্চিত করেন, 'আমরা কয়েক মাস ধরে তাকে পর্যবেক্ষণ করছি। কিন্তু এটা স্পষ্ট, সে আমাদের হয়ে খেলতে পারবে না।' ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আগেও নাকি ফিফাকে রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন, ফলাফল আবারও শূন্য।

সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক দৃশ্যটি হয়তো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। স্পেনের বিপক্ষে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়েন কোর্তোয়া। ৭১ মিনিটে তার জায়গায় নামেন সেনে লামেন্স। লামেন্সের ভুলেই শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেন ২-১ গোলে এগিয়ে যায়। ওই মুহূর্তে টিভির পর্দার সামনে বসে থাকা সভিলারের মনে নিশ্চয়ই একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেয়েছিল—ওই ৭১ মিনিটে মাঠে নামার কথা ছিল তারই।

সার্বিয়ার দরজা এখনো বন্ধ নয়। ২০২৫ সালে সার্বিয়ার কোচ ভেলিয়াকো পাউনোভিচ টিভি অ্যারেনা স্পোর্টকে বলেন, 'আমি ওর সঙ্গে কথা বলেছি। ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর খেলবে না। আমি চেষ্টা করেছি ওকে বোঝাতে যে সে গুরুত্বপূর্ণ, চাইলে জাতীয় দলে জায়গা আছে।'

কিন্তু কোচের ডাকেও সাড়া দেননি সভিলার। কারণ, তিনি যে দেশের জার্সি গায়ে জড়াতে চান, সে দেশের দরজায় ফিফা তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে।

দেব্রেচেনের সেই বুধবারে মাঠে নামার সময় হয়তো তিনি ভেবেছিলেন, এ তো কেবল একটি প্রস্তুতি ম্যাচ। জানতেন না, ওই ৪৫ মিনিটই তার সমগ্র আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার হয়ে থাকবে—আর ফিফার এক নিয়ম তাকে আজীবন বন্দি করে রাখবে এক অচেনা গন্তব্যে।

ইত্তেফাক/এনএন