ইরানি হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে পরিবারসহ কূটনীতিক সরাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৮

ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ থেকে কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরবে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন, এমন কর্মীদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদেরও চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননের মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতেও কর্মীসংখ্যা সমন্বয় করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে সিএনএন।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির কারণে যেসব কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্প্রতি কর্মস্থলে ফিরতে দেওয়া হয়েছিল, তাদের অনেককেই আবারও সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে। এতে পরিবারগুলোর মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

গত ২৩ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক জে ক্লেটন জানান, মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে বলে গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। স্মারকলিপিটির বিষয়বস্তু প্রথম প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, বিদেশে কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কর্মী মোতায়েনের বিষয়ে নিরাপত্তাসংক্রান্ত নতুন তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়। হুথিদের হামলার হুমকি এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের তথ্যের ভিত্তিতে সীমিত কার্যক্রমের আওতায় থাকা দূতাবাসগুলোতে কর্মীসংখ্যা সমন্বয় করা হচ্ছে।

তবে এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া নিয়ে মার্কিন কূটনীতিকদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কূটনীতিক সিএনএনকে বলেন, পরিস্থিতিকে শুধু বিশৃঙ্খল বললে কম বলা হবে। তার ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নিতে যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রে পুরো ব্যয় মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

যুদ্ধের শুরুর দিকে কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়া অনেক পরিবারকে নতুন বাসস্থান খুঁজতে এবং সন্তানদের অন্য স্কুলে ভর্তি করাতে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। সম্প্রতি তারা আবার কর্মস্থলে ফিরে স্থিতিশীল হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। এখন নতুন করে সরে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়ায় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন তারা।

আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র নিকি গেমার বলেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিবারগুলো যে বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তারই পুনরাবৃত্তি। অনেক পরিবার কেবল নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে শুরু করেছিল। এর মধ্যেই আবার চলে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়ায় তারা হতাশ, বিভ্রান্ত ও ক্ষুব্ধ।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা শুক্রবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী ও তাদের পরিবারকে দৈনিক ভাতা এবং বাসস্থান ও স্কুলসংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী নির্ধারিত সরকারি হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

সৌদি আরবে হুথিদের তৎপরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে কর্মী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর এর আগে সতর্ক করে বলেছে, হুথিদের হামলার ঝুঁকি তাৎক্ষণিক লক্ষ্যবস্তুর আশপাশের এলাকা ছাড়িয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ নিতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ দিলেও এখন পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

চলতি সপ্তাহে সৌদি আরব থেকে জরুরি দায়িত্বে নেই, এমন মার্কিন কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননের মার্কিন দূতাবাসগুলোতে কর্মীসংখ্যা গোপনে সমন্বয় করা হচ্ছে বলে সিএনএনকে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, লেবানন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও জর্ডানে সীমিত কার্যক্রমের আওতায় কর্মীদের উপস্থিতিতে সাময়িক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। তবে কুয়েত ও বাহরাইনে কর্মীসংখ্যায় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি বলে জানান তিনি।

কর্মীদের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয় উল্লেখ করে ওই কর্মকর্তা বলেন, সীমিত কার্যক্রমের আওতায় দূতাবাসগুলোতে কর্মীসংখ্যা প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় করা হয়ে থাকে।

সৌদি আরবের ক্ষেত্রে কর্মীদের আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও অন্য কয়েকটি দেশের দূতাবাস থেকে কর্মী সরানোর বিষয়ে প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া হয়নি। পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এসব দূতাবাসের কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সেগুলো আগের মতোই সীমিত কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে। তবে এই অবস্থার মধ্যেও কর্মীসংখ্যা কমানো বা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়া দূতাবাসকর্মীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত এক সূত্র বলেন, তাদের কাছে মনে হচ্ছে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অনেককে কর্মস্থলে ফিরতে দেওয়া হলেও এখন আবার তাদের চলে যেতে হচ্ছে। সব দূতাবাসে সন্তানদের ফিরতে দেওয়া না হলেও অনেক ক্ষেত্রে জীবনসঙ্গীদের ফেরার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

প্রত্যাহার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত একটি সূত্রের অভিযোগ, ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও মাঠপর্যায়ের কূটনীতিকদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে আবারও জটিলতা দেখা দিয়েছে। কর্মীদের পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গেলে তাদের দৈনিক ভাতা দেওয়া হবে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কিছু দূতাবাসে কর্মীদের নিয়ে প্রচলিত পরিকল্পনা বৈঠক বা টাউন হল সভাও হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকে নিজ নিজ দূতাবাসের নেতৃত্বের কাছ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার আগেই সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে প্রত্যাহারের খবর জানতে পেরেছেন।

আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, এ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে তারা বিভিন্ন অভিযোগ পাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, যেসব পরিবার সম্প্রতি কর্মস্থলে ফিরেছে এবং সন্তানদের আবার স্কুলে ভর্তি করিয়েছে, তাদের আর্থিক সহায়তার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা ছাড়াই নতুন করে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হচ্ছে।

নিকি গেমার বলেন, সৌদি আরবের বাইরে থাকা কয়েকটি দেশের পরিবারগুলোও আবাসন সহায়তা ও দৈনিক ভাতা নিশ্চিত না করেই চলে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়ার কথা জানিয়েছে। দূতাবাসগুলোর কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক অবস্থায় পরিবর্তন না আসায় এসব সুবিধা পাওয়া নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে তাদের জানানো হয়েছে।

বিদেশে হঠাৎ বাসস্থান ছাড়তে হলে নতুন বাড়ি খোঁজা ও অন্যান্য জরুরি ব্যয় মেটাতে পরিবারগুলো সাধারণত এসব ভাতার ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে পরিবারের কোনো সদস্যকে জরুরি দায়িত্বে দূতাবাসে থেকে যেতে হলে এ ধরনের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গেমার বলেন, বিমানে ওঠার আগেই পরিবারগুলোর জানা প্রয়োজন, নতুন জায়গায় বাসস্থানের খরচ কীভাবে মেটানো হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তা বলেন, সীমিত কার্যক্রম, অনুমোদিত প্রস্থান কিংবা বাধ্যতামূলক প্রত্যাহারের আওতায় থাকা কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের জন্য এ সময়টি যে কঠিন, তা কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারছে। অতিরিক্ত ব্যয় ও সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করানোসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবারগুলোকে সহায়তা করার চেষ্টা চলছে। সাম্প্রতিক পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং আগামী দিনগুলোতে আরও বিস্তারিত জানানো হবে।

ইত্তেফাক/এসজেএস