আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় যারা সাহিত্যচর্চা করে এই ভাষার মর্যাদাকে উন্নত করেছেন এবং বাঙালির জীবন ও ইতিহাসকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন তাদের মধ্যে একজন রিজিয়া রহমান। তিনি ১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর ভারতের কলকাতার ভবানীপুরে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নাম ছিল জোনাকী। বাবা আবুল খায়ের মোহম্মদ সিদ্দিক ছিলেন একজন চিকিত্সক, আর মা মরিয়ম বেগম ছিলেন গৃহিণী। বাবার চাকরির কারণে তার শৈশব কেটেছে ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে চলে আসেন। দেশের ফরিদপুরে তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তার প্রিয় লেখক ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯৫০ সালে তিনি যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন তখন তার লেখা গল্প ‘টারজান’ সত্যযুগ পত্রিকায় ছোটদের পাতায় প্রকাশিত হয়। রিজিয়া রহমান ১৯৬৫ সালে ইডেন মহিলা কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রিজিয়া রহমান সাহিত্য পত্রিকা ‘ত্রিভুজ’-এর সম্পাদক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। শৈশব থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় তার কবিতা-গল্প ছাপা হলেও প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অগ্নি স্বাক্ষরা’ ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়। রিজিয়া রহমান ছেলেবেলায় স্বপ্ন দেখতেন কবি হবেন। বেশকিছু কবিতাও লিখেছেন তিনি। পরবর্তী সময়ে কবিতা বাদ দিয়ে গদ্য সাহিত্যে হাত দেন। রিজিয়া রহমানের লেখায় সমাজের বাস্তবতা, নিচুস্তরের মানুষের কথা এবং বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসই প্রধান বিষয়। তিনি নির্যাতিত নারীদের নিয়েও প্রচুর লিখেছেন। তিনি যা দেখতেন, বিশ্বাস করতেন এবং যা তাকে আকৃষ্ট করত তা নিয়েই লিখতেন। গল্প-উপন্যাস লেখার সময় প্রতিটি চরিত্রের ভেতর ডুবে যেতেন। রিজিয়া রহমান অনেক ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তিনি অধিক সমাদৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস হলো—ঘর ভাঙা ঘর (১৯৭৪), উত্তর পুরুষ (১৯৭৭), রক্তের অক্ষর (১৯৭৮), বং থেকে বাংলা (১৯৭৮), অরণ্যের কাছে (১৯৮০), শিলায় শিলায় আগুন (১৯৮০), ধবল জোছনা (১৯৮১), একাল চিরকাল (১৯৮৪), সবুজ পাহাড় (১৯৮৫), সীতা পাহাড়ে আগুন (২০১০) প্রভৃতি। গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি তিনি কবিতা, রম্যরচনা, আত্মজীবনীও লিখেছেন। তোমরা বড় হয়ে তার সব লেখা নিশ্চয়ই পড়বে। তিনি তোমাদের জন্য শিশুসাহিত্যও রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ গ্রন্থগুলো হলো—আজব ঘড়ির দেশে, ঝিলিমিলি তারা, মতিশীলের বাড়ি ও অন্যান্য গল্প প্রভৃতি। কথাসাহিত্যের জন্য তিনি বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। রিজিয়া রহমান ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে যশোর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে আসফ-উদ-দৌলা রেজা স্মৃতি পুরস্কার, ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ লেখক সংঘ সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯০ সালে কমর মুশতারি সাহিত্য পদক, ১৯৯৫ সালে অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক এবং ২০১৯ সালে একুশে পদক পান।
রিজিয়া রহমান অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। অতি সহজেই মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন। গত ১৬ আগস্ট ২০১৯ এই মহিয়সী নারী পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। তার জন্য রইল আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
