যে কোনো লেখকের লেখার প্রধান উপজীব্য মানুষ, মানুষের জীবন, জীবনের আনন্দ-বেদনা। কিন্তু ক’জন শেকড়সন্ধানী লেখক সত্যিকার অর্থে তুলে আনতে পারেন তার অনুসন্ধানী অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে মানুষকে, মানুষের বেঁচে থাকার নিগূঢ়তম সত্য, সৌন্দর্য এবং বিচিত্রতাকে! রিজিয়া রহমান তা দক্ষতার সঙ্গেই পেরেছেন।
বিশ্বসাহিত্যে যে সব কথাশিল্পী নোবেল পেয়েছেন, তাদের অনেকের চেয়েই রিজিয়া রহমানের উপন্যাস কোনো অংশেই কম শক্তিশালী নয় বলে আমার বিশ্বাস। ১৯৫৮ সালে বেলুচিস্তান বিদ্রোহের পটভূমিতে রচিত চেতনায় নাড়া দেওয়ার মতো তার উপন্যাস ‘শিলায় শিলায় আগুন’ কিংবা নিষিদ্ধপল্লির দেহপসারিণীদের মানবেতর দৈনন্দিন ঘটনাবলি নিয়ে লেখা ‘রক্তের অক্ষর’ প্রকৃত অনুবাদ হলে, বিশ্বসাহিত্যে শক্তিশালী রিজিয়া রহমানের শক্ত আসন এবং অবস্থান নির্ণয় হতো, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
তিনি প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতো ইতিহাস আর ঐতিহ্য খুঁড়ে খুঁড়ে তুলে এনেছেন প্রায় প্রতিটি উপন্যাস। যেমন, ‘বং থেকে বাংলা’ উপন্যাসটির ব্যাপ্তি বাঙালির জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে বং গোত্র থেকে শুরু হয়ে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিজয় পর্যন্ত এই উপন্যাসের বিস্তৃতি। বাংলার সাধারণ মানুষ সবসময়ই অবহেলিত, নির্যাতিত এবং উপেক্ষিত। তারা কোনোদিনই অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক মুক্তি পায়নি। তবে স্বাধীনতার মর্যাদায় এসে দাঁড়িয়েছে।
আবার নীল বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে খুলনা অঞ্চলের এক বিপ্লবী রহিমউল্লাহর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার বীরত্বগাথা নিয়ে লিখেছেন ‘অলিখিত উপাখ্যান’। বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির সাঁওতাল শ্রমিকদের জীবনচিত্র পর্যবেক্ষণ করে তিনি রচনা করেছেন—‘একাল চিরকাল’। ‘প্রাচীন নগরীতে যাত্রা’ উপন্যাসে লিখেছেন ঢাকার অতীত ও বর্তমান জীবনযাপন। বিলুপ্ত মসলিন তাঁতিদের নিয়ে লেখা ‘আবে রঁওয়ার কথা’ও এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা ‘কাছেই সাগর’, ‘একটি ফুলের জন্য’ অথবা নব্বইয়ের স্বৈরচারবিরোধী আন্দোলন নিয়ে রচিত উপন্যাস ‘হারুণ ফেরেনি’ আমাদের ইতিহাসের অংশ।
অপরদিকে চট্টগ্রামে হার্মাদ জলদস্যুদের অত্যাচার এবং পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের দখলদারিত্বের চিত্র তুলে ধরেছেন—‘উত্তর পুরুষ’ উপন্যাসে। যাতে চিত্রিত হয়েছে আরাকান-রাজ-সন্দ-সুধর্মার অত্যাচার, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের বীরত্ব, পর্তুগিজদের ব্যবসায়ীদের গোয়া, হুগলি, চট্টগ্রাম দখলের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস, বাঙালির জাতিসত্তা, জাতিসত্তার জাগরণ, জাতিসত্তা গঠনের বিবর্তন, তৃণমূলের জীবনযুদ্ধ, ইত্যাদি তাঁর উপন্যাসকে দিয়েছে উচ্চাসন ও ভিন্ন মর্যাদা।
নদী ভাঙনে সর্বহারা মানুষের শহরে এসে গড়ে তোলা বস্তিজীবন নিয়ে লেখা প্রথম উপন্যাস ‘ঘর ভাঙা ঘর’ থেকে শুরু করে চাবাগানের জীবনচিত্র নিয়ে ‘সূর্য-সবুজ রক্ত’, অভিবাসীদের নিঃসঙ্গতা ও নিরাপত্তাহীনতা তুলে ধরেছেন ‘সোনার হরিণ চাই’ উপন্যাসে। আবার কিশোরদের জন্য ‘আজব ঘড়ির দেশে’ শিক্ষামূলক সায়েন্স ফিকশন যাতে পৃথিবীর জন্ম বা উত্পত্তি থেকে পৃথিবী কত স্তর পরিবর্তন করে, কীভাবে আবহাওয়া, প্রাণীর বিবর্তন হতে হতে আধুনিক পৃথিবী পর্যন্ত মানুষ উপস্থাপন করেছেন।
রিজিয়া রহমান মাটি ও মানুষের জীবনধারা ও ভাষা-সংস্কৃতির রূপকার। তাঁর গল্প-উপন্যাসে গণমানুষের যাপিত জীবন, চারপাশের অসঙ্গতি ও বৈষম্য ধরা পড়ে। রিজিয়া রহমান কখনোই কোনো গণ্ডির মধ্যে আটকে থাকেননি, সীমাবদ্ধ রাখেননি নিজেকে। এক উপন্যাস অতিক্রম করে আরেক উপন্যাসের দিকে ধাবিত হয়েছেন। ফলে তার প্রতিটি উপন্যাসের প্রেক্ষাপট স্বতন্ত্র, ভিন্ন, বিবিধ, বিচিত্র এবং বহুমাত্রিক।
প্রাচীন বাংলার ইতিহাস থেকে আধুনিক বাংলাদেশের জন্ম, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের বাস্তবতা, বস্তিবাসী, বারবণিতা, চা-শ্রমিক, সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর জীবন-লড়াই, প্রবাসজীবনের নানা সংকট থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট উপজীব্য হয়ে উঠেছে। তিনি লিখেছেন আশ্চর্য নির্লিপ্ততায়, কঠিন শ্রম ও সাধনায়। [দ্র. রিজিয়া রহমান : যে পথে অনন্য/ মোজাফ্ফর হোসেন, বিডি আর্টস, ১৮ আগস্ট, ২০১৯। ঢাকা]।
এভাবেই রিজিয়া রহমান নির্মাণ করেছেন তাঁর লেখালেখির জগত্। এত বড় মাপের লেখককে আমরা কি যথার্থ মূল্যায়ন করতে পেরেছি? তিনি শুধু বড়মাপের লেখকই নয়, বড় মনের মানুষও বটে! নির্লোভ, নিভৃতচারী মানুষ! শেষ বয়সেও উত্তরার বাসায় একাই নীরব জীবনযাপন করেছেন এবং নিভৃতেই চলে গেলেন। কখনো তিনি খ্যাতির জন্য ভাবেননি, স্বীকৃতি বা সম্মাননার জন্য আপোস করেননি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার ৪১ বছর পর পেলেন একুশে পদক।
ব্রিটিশ লেখক কেন ফোর্ড-পাওয়েল তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘Rahman focuses often on the plight of women in Bangladesh. Readers find poverty, cruel treatment at the hands of husbands, and an often excessively patriarchal society at the core of her work, and she represents Bengali women skilfully and empathically.’। অর্থাত্ ‘রহমান বাংলাদেশের মহিলাদের দুর্দশার দিকে প্রায়শই মনোনিবেশ করেন। পাঠকরা দারিদ্র্য, স্বামীর হাতে নিষ্ঠুর আচরণ এবং প্রায়শই অত্যধিক পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে তার কাজের মূল অংশ হিসেবে খুঁজে পেয়েছেন এবং তিনি বাঙালি মহিলাদের দক্ষ এবং দক্ষতার সাথে প্রতিনিধিত্ব করেছেন’। [দ্র. Caged in Paradise and Other Stories by Rizia Rahman/ Ken Ford-Powell | RASt3, June 25, 2013, United States.]।
একজন বিদেশি লেখকও বুঝতে পেরেছিলেন রিজিয়া রহমানকে, রিজিয়া রহমানের লেখাকে। এখানেও রিজিয়া রহমানের যথার্থ সার্থকতা।
রিজিয়া রহমান (২৮ ডিসেম্বর ১৯৩৯—১৬ আগস্ট ২০১৯)
