হাওরের সন্নিকটে জলমালা। উত্তর দিগন্তে দৃশ্যমান-মেঘ-পাহাড়ের লুকোচুরি; নিচে বাতাস আসছে ধেয়ে। তারই সুর ঢলকে উঠেছে, উত্তর থেকে দক্ষিণে; কিংবা পুবের হাওয়ায় পশ্চিমে। এমন এক জনপদ মহাবাহু ব্রহ্মপুত্র তাকে দীর্ঘদিন নিরাপদ দূরত্বে রেখেছে। স্বাধীনচিন্তা; জীবনযাত্রার এ এক লীলাভূমি। বাঙালির প্রাণের গীতরস ধারায় উজ্জীবিত গীতিকাগুলো এসব অঞ্চলেরই সাংস্কৃতিক ভাবসম্পদ।
নেত্রকোনা জেলা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটারের পথ : গৌরীপুর থেকে একটি পথ চলে গেছে তারই হূত্স্পন্দন বেয়ে। আরেকটিপথ গেছে মদনে। এ চার রাস্তার মিলনক্ষেত্রের একদিকের এক অখ্যাত গ্রাম চন্দ্রপাড়া। এ গ্রামেই ১৮ আগস্ট ১৯৩৬ জন্ম নেন আজকের বর্ষীয়ান বুদ্ধিজীবী, বাগ্মী, বিদ্যাব্রতী যতীন সরকার।
‘যাকে বলে অজপাড়া গাঁ, বাংলাদেশের তেমন একটি গাঁয়ে আমার জন্ম। এ-রকম সকল গাঁয়েরই সকল ছেলে-বুড়ো পাকিস্তানের জন্মের সময় গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন কেউ উল্লাসে, কেউ ভয়ে, কেউ আহ্লাদে, কেউ বিস্ময়ে, কেউ আশায়, কেউ আক্রোশে। তবে সকলের মধ্যেই ছিল টান টান উত্তেজনা। এই সব কিছুই আমি গাঁয়ের মানুষের একেবারে ভেতর মহল থেকে দেখেছি।’
‘একেবারে ভেতরের মহল থেকে’ দেখে এসব কিছু ধরে রাখার প্রবল ক্ষমতা তিনি অর্জন করেছিলেন নিজ পরিবার থেকেই। গুরুজনদের প্রদর্শিত পথই তাকে ‘যতীন সরকার’ তৈরিতে সাহায্য করেছে। বড়দের সঙ্গে শৈশব কাটানো অভিজ্ঞতা তাকে আর দশজন থেকে আলাদা করেছে। তার পাঠপর্বও রয়েছে জ্যাঠামিতে ভরা। ঈশ্বরচন্দ্র, বঙ্কিচন্দ্র, মাইকেল মধুসূদন পাঠ দিয়ে শুরু। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি সমগ্র ‘বঙ্কিম পাঠ’ চুকিয়ে ফেলেন। স্কুলপাঠ্য অন্যসব প্রতিভাবানদের মতো তারও ছিল অনীহা। এ পাঠপর্ব ছিল রবীন্দ্রভাষ্যমতো ‘রোগী যেন নিম খায় মুদিয়া নয়ন।’ বারবার বাধা-বিপত্তি এসেছে, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে। ‘উল্লাসে’র চেয়ে ‘আক্রোশ’ই বেশি ছিল তার জীবনমেরুতে। ‘দারিদ্র্য’ তাঁর জীবনে এসেছে ‘কণ্টক মুকুট শোভা’ হয়ে। কৈশোর এবং প্রাক-যৌবনে বহুবার তাকে স্থান বদল করতে হয়েছে। পড়াশোনার জন্য কখনো পেয়িং গেস্ট, কখনো লজিং ইত্যাদি নিয়েই তার চলিষ্ণু সংগ্রামজীবন।
১৯৬৩ সালে এমএ পাস করে তিনি যোগ দেন গৌরীপুর হাই স্কুলে। তারপর ১৯৬৪ সালে ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজে। সেখান থেকে ২০০২ সালে অবসর নেন। ছাত্রাবস্থায় যে শিক্ষকতার শুরু করেছিলেন তা শেষ হয়নি আজও। আজও বক্তৃতার মঞ্চে মাইক্রোফোন সামনে পেলে, শিক্ষকতা করতে ছাড়েন না। সমাজ বদলের জন্য মানুষের মনে আদিম সাম্যবাদী চৈতন্যটি জাগ্রত করার নিরলস চেষ্টা চালান। নিজ জীবনকে পরিচালনা করেন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদীর আলো ফেলে। সমাজের প্রত্যেক স্তরের ভেতরের দ্বন্দ্বগুলো সমাজ শৃঙ্খলার পরিবর্তনে সাহায্য করবে; এমন ধারণা যে ক’জন বস্তুবাদী গবেষক মগজে-হূদয়ে ধারণ করেন যতীন সরকার তাদের অন্যতম। তাতে তার ব্যক্তিগত মাঙ্গলিক প্রয়োজন না মিটলেও, সমষ্টির মাঝেই ব্যষ্টির আনন্দ খোঁজেন। বিচ্ছিন্নতা নয়, নিপীড়িত মানুষের ঐক্যের শিকলে আবদ্ধ সমাজ সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবেলা করে বৈশ্বিক শান্তি আনবে এ তাঁর বিশ্বাস। খেয়ো খেয়ো সমাজ থেকে ভিন্ন ধারার ‘দিব আর নিব মিলাব মিলিব’—এমন সমাজই তার বিবেচনায় উত্কৃষ্ট। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন কার্ল মার্কস বর্ণিত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের নিরিখেই আগামী সমাজ-শৃঙ্খলায় পরিবর্তন আসতে বাধ্য। লেনিনের কাছে কার্ল মার্কসের দ্বৈতবাদ যেমন অভ্রান্ত মনে হয়েছিল, যতীন সরকারের কাছেও তাই। দ্বৈতবাদের তত্ত্ব থিসিস-অ্যান্টিথিসিস-সিনথেসিস। এ প্রক্রিয়ায় থিসিস যদি হয় পুঁজিবাদী সমাজ; শোষিত সামজ হবে অ্যান্টিথিসিস এবং বিপ্লবের দ্বারা পরিবর্তিত নতুন শ্রেণির জীবন-সমাজ হবে অ্যান্টিথিসিস। আর এ পরিবর্তন হবে গ্রামসি কথিত চেতনার স্তরে মানুষের গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে। ভোগবাদী সমাজের খেয়ো খেয়ো নীতি, সাম্রাজ্যবাদের পুতুল ধর্মীয় উগ্রবাদ; করপোরেট বিশ্বের নতুন শোষণ থেকে পরিত্রাণে; তৃতীয় বিশ্বকে যেনতেনভাবে গা ভাসালে যে চলবে না—তা নিয়েও তিনি বারবার সতর্ক করে দেন। আর এ জন্যেই গণশিক্ষক তিনি। মানবতার শিক্ষকও। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতার জীবনে বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার শ্রীবৃদ্ধি করেন। মফস্বলীয় জীবন কাটিয়েও যে বিশ্ববীক্ষা তৈরি করেছিলেন, তার ফল তিনি পেতে চলেছেন। পড়ন্ত বেলায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতির পদ অলংকৃত করেন তিনি। ১৯৮৫ সালে ‘সাহিত্যের কাছে প্রত্যাশা’ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি যে জানান দিয়েছিলেন তা আজ অব্দি চলছে। ১৯৬৭ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তানের উপন্যাসের ধারা’ শীর্ষক প্রবন্ধ লিখে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যের নতুন ধারা তৈরি করে, বোদ্ধা সমাজে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। বঙ্কিম চন্দ্র কথিত Intelligent Criticism ছাড়া বাংলা সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধির কোনো আশা নেই। তিনি তা উপলব্ধি করেই মনোসংযোগ ঘটিয়েছেন সমালোচনামূলক প্রবন্ধে। এ ধারার আলোচনায় স্বর্ণপদকও লাভ করেছিলেন। সেই পদকের শোভা আজও বেড়ে চলেছে। ‘পাকিস্তানের জন্ম-মৃত্যু-দর্শন’-এর জন্য প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার , বাংলা একাডেমি পুরস্কার, স্বাধীনতা পুরস্কার ইত্যাদি পদকে ভূষিত তিনি। পুরস্কারের লাভে-লোভে নয় জীবনের প্রয়োজনে, জীবনকে গড়ে তুলেছিলেন দাদু-দিদিমা-ঠাকুরদা-ঠাকুরমা এবং বাবার নির্মোহ আদর্শিক পথে। কৈশোরের রামপুরের ‘দুনিয়ার জানালা’য় যে শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেছেন আমজনতার সান্নিধ্যে এসে তা-ই তাকে বিশ্বদর্শন গ্রহণে সহায়তা করেছে। বক্তা বা লেখক হতে গেলে যে পাঠক হতে হয় তা থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। পাঠাভ্যাসের একপর্যায়ে যোসেফ স্টালিনের ‘দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ’ এবং মানবেন্দ্র রায়ের ‘ইসলামের ঐতিহাসিক অবদান’ যে বিশ্ববীক্ষার দীপ জ্বালিয়ে দিয়েছিল; তাতেই তিনি ‘কমিউনিজম’-এ দীক্ষা গ্রহণ করে রসিকতা করে বলেন—‘আমি কম অনিষ্টি করি তাই কমিউনিস্ট।’ এমন হাস্যরসে ভরা মানুষের জন্য উত্সর্গিত জীবন, ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনে বিনাবিচারে ‘লাল দালানের চৌহদ্দি’ পেরুতে হয়। কিন্তু সেই কারা প্রকোষ্ঠের ভেতর বসে অন্য রাজবন্দিদের আনন্দসঙ্গ দান করেও রচনা করেন ‘ব্যাকরণের ভয় অকারণ’ এবং মার্কস কথিত Free development of each is the precondition for free development of all’ এ দর্শনের ভিত্তিতে একটি চীনা প্রবাদকে অবলম্বন করে লিখেছিলেন নাটক ‘সব পাওয়ার মন্ত্র।’ তাতে তাঁর সৃজনশীল শক্তিরও প্রকাশ ঘটে। ঐতিহ্য অনুসন্ধানের শেকড় ছিল তাঁর গ্রামীণ সমাজে। তাই ঠাট্টা করে বলেন, ‘আমি গাইয়্যাই রয়ে গেলাম।’ এ ঠাট্টায় তথাকথিত ভোগবাদী নাগরিকদের প্রতি কতটা বিদ্রূপ, কতটা শ্লেষ; তা কেবল তিনিই বলতে পারেন। গ্রাম্য জীবনপটের স্বশিক্ষিত মানুষের লোকধর্মজাত অভিজ্ঞতা দিয়েই প্রত্যক্ষ করেছিলেন বিষফোঁড়ার মতো সাম্প্রদায়িকতা; দ্বিজাতিতত্ত্বের বেদনাঘন সহিংসতা। এর ফলে রাষ্ট্রীয় জীবন কীভাবে নাগরিকদের ক্ষত-বিক্ষত করে; পাপ-পঙ্কিল পথে টেনে নিয়ে যায় সে সব তিনি অবলোকন করেছেন নির্মোহ দর্শকের দৃষ্টিতে। মহাভারতের সঞ্জয়ের মতো দিব্যদৃষ্টি দিয়ে তিনি লিখে গেছেন তার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ। যার মধ্যে যেমন রয়েছে সংগঠিত দুর্বিপাক, তেমনি রয়েছে আশার আলো। যে ‘আশার আলো’টি আজও বিশ্বপরিস্থিতির ঘোর অমানিশার মাঝেও তিনি, নেত্রকোনার সাতপাইয়ের শেষ বয়সের নিরাপদ আবাসস্থল ‘বানপ্রস্থ’ থেকে জ্বালিয়ে যাচ্ছেন।
দিদিমার সেই ‘অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলকায়া’কে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন বিদ্যাকে ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েই, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব যদি বিচার হয় শিক্ষা-জ্ঞান-মনীষা চরিত্র দ্বারা, তাহলে যথার্থ বিদ্যাই তার কর্ম-নিয়ন্তা। সে বিদ্যাই তিনি আয়ত্ত করেছিলেন; অন্য কিছু ছাপিয়ে তাই তিনি বিদ্যাব্রতী। ১৮ আগস্ট ২০১৯ তাঁর ৮৪তম জন্মদিন। জন্মদিনে তাই রাশি রাশি শুভেচ্ছা। ‘চৌ-রাশি’ শুভেচ্ছা।
