এমপি মাসুদ সাঈদীর রিসোর্টের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিল প্রশাসন

আপডেট : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০৮

যথাযথ কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক ছাড়পত্র ও অনুমোদন ছাড়া মাস্টারপ্ল্যান লঙ্ঘন করে গড়ে তোলার অভিযোগে পটুয়াখালীর পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটায় নির্মাণাধীন ‘ইস্তাম্বুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’-এর যাবতীয় কাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিনে অভিযান চালিয়ে নির্মাণকাজে আনুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়। আলোচিত এই মেগা রিসোর্ট প্রকল্পটির চেয়ারম্যান পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-ইন্দুরকানী) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী।

কাজ বন্ধের নির্দেশ কার্যকরের পরপরই কুয়াকাটা পৌরসভা ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকল্প এলাকায় লাল অক্ষরে নিষেধাজ্ঞার সতর্কতামূলক ব্যানার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ব্যানারে উল্লেখ রয়েছে—‘এই স্থাপনাটি যথাযথ অনুমোদন ব্যতীত নির্মাণের কারণে নির্দেশক্রমে কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হলো। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

স্থানীয় সূত্র ও ভূমি প্রশাসন থেকে জানা গেছে, কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী মৌজার এসএ ২৯২ নম্বর খতিয়ানে প্রায় ২১ একর ৬৬ শতক জমিতে এই বহুতল রিসোর্ট প্রকল্পটি গড়ে তোলা হচ্ছিল। চলতি বছর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কুয়াকাটা পৌর এলাকার মুসল্লীয়াবাদ গ্রামসংলগ্ন জমিতে জোরেশোরে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ইতিমধ্যে প্রকল্প এলাকার প্রায় ছয় একর জমি ঘিরে সুবিশাল সীমানাপ্রাচীর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। সেখানে একটি আধুনিক মসজিদ ও বিশাল কনভেনশন হল নির্মাণের অবকাঠামোগত কাজও পুরোদমে চলছিল।

মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সরাসরি কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন কুয়াকাটা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান এবং কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেকসহ প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইস্তাম্বুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের স্থানীয় প্রতিনিধি মনির মুসুল্লি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি জানান, অভিযানের সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না এবং কলাপাড়ায় অবস্থান করছিলেন। ফলে এ বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। অন্যদিকে প্রকল্পের চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া যেকোনো ধরনের বহুতল স্থাপনা নির্মাণ প্রচলিত আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। এর বাইরে আরও বড় আইনি জটিলতা হলো, সরকারের গৃহীত কুয়াকাটার মহাপরিকল্পনায় (মাস্টারপ্ল্যান) সংশ্লিষ্ট জমিটি রেলওয়ের ভবিষ্যৎ অবকাঠামো ও স্থাপনার জন্য নির্ধারিত রয়েছে। বিএস জরিপ অনুযায়ী জমিটি কুয়াকাটা পৌরসভার আওতাধীন হলেও কোনো অনুমতি ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়ায় এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেন, কুয়াকাটার মাস্টারপ্ল্যান ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে যেকোনো স্থাপনা নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র নেওয়া বাধ্যতামূলক। এর আগেও ইস্তাম্বুল রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা সেই নির্দেশ তোয়াক্কা করেনি।

ইউএনও আরও জানান, গত সোমবার বিভাগীয় কমিশনার মহোদয় কুয়াকাটা পরিদর্শনে এসে এ বিষয়ে স্পষ্ট প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই এই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটির মালিক বা উদ্যোক্তা কে, সেটি প্রশাসনের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়; আইন সবার জন্যই সমান। তবে জানতে পেরেছি প্রকল্পটি পিরোজপুরের একজন সংসদ সদস্য নির্মাণ করছেন। যদিও এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে প্রশাসনের কোনো আনুষ্ঠানিক কথা হয়নি।’

ইত্তেফাক/এনএন