দক্ষিণের কৃষক উদ্ভাবিত শতবর্ষ প্রাচীন কৃষি পদ্ধতি ভাসমান সবজি চাষ স্বীকৃত বিশ্ব কৃষি ঐতিহ্য। স্থানীয় সৃজনশীল প্রযুক্তির এ ব্যতিক্রমী কৃষি তাই স্থান পেয়েছে সরকারের মনোযোগের বিশেষ কেন্দ্রে। চাষের আদিস্থানসহ দেশের অন্য অঞ্চলের চাষোপযোগী জলাভূমিতে এ পদ্ধতি উন্নত, সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণে কৃষি মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন শুরু করেছে বিভিন্ন প্রকল্প। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের কৃষি সেক্টর। এর অভিযোজনে ভাসমান সবজি চাষের এ সম্প্রসারণ প্রয়াস এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে পরিবেশ গবেষক ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের আশাবাদ।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের তিন জেলা গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশালের একটি নির্দিষ্ট ও অভিন্ন বেসিন এলাকার জলাভূমিতে আবাদকৃত ভাসমান শাকসবজি পদ্ধতিকে ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর বিশ্ব কৃষি ঐতিহ্যভুক্ত করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এ ভাসমান কৃষি পদ্ধতিকে গ্লোবালি ইমপর্ট্যান্ট এগ্রিকালচারাল হেরিটেজ সিস্টেম (জেআইএএইচএস) বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। ভাসমান বা ধাপচাষ এ অঞ্চলের একটি স্থানীয় সৃজনশীল পদ্ধতি। কৃষকেরা ঐতিহ্যগতভাবে প্রায় ২০০ বছর আগে থেকেই গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশাল জেলার অভিন্ন জলাভূমির পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে এ ভাসমান চাষ করে আসছেন। স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তিটি পরিবেশবান্ধব ও বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিযোজনের উপযোগী বলে প্রযুক্তিটির গুরুত্ব অনুধাবন করে এ বৈশ্বিক স্বীকৃতি। যার ফলে বহির্বিশ্বে প্রযুক্তিটির পরিচিতির পাশাপাশি দেশের পরিচিতির সুযোগ বৃদ্ধির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কৃষি পর্যটন এলাকা গড়ে ওঠে সেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভাসমান কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে পারছেন।
ভাসমান কৃষি প্রযুক্তির স্থায়িত্ব ধরে রাখতে প্রচলিত কৃষি প্রযুক্তিকে গবেষণার আওতায় এনে আরো উন্নত লাগসই করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় বিশেষ বিশেষ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে। দেশের এই তিন জেলা পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি), গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, কোটালিপাড়া, মুকসুদপুর ও সদর এবং বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার ২৫০০ হেক্টর জমিতে ব্যাপকভাবে ভাসমান পদ্ধতিতে কৃষকরা শাকসবজির চাষ করেন। যার সঙ্গে প্রায় ১০ লাখ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ও দেউলবাড়ি দোবরা এবং বরিশালের বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ইউনিয়নে স্বাধীনতার পরে এ চাষটির ব্যাপক বিস্তার ঘটে বাণিজ্যিকভাবে। ২০১৩-২০১৬ সাল মেয়াদে অধিদপ্তরের উদ্যোগে ১০টি জেলার ৪২টি উপজেলায় এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের জন্য “ভাসমান সবজি ও মসলা উত্পাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ” শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট যথাক্রমে এরই মধ্যে দেশের আটটি বিভাগের ২৪টি জেলার ৪৬টি উপজেলায় এবং ১৩টি জেলার ২৫টি উপজেলায় পৃথকভাবে দুটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা চাষ গবেষণা সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণ নামে প্রকল্পটি ২০১৭ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়েছে যা ২০২২ সালের জুন মাসে শেষ হবে। প্রকল্প পরিচালক ড. মো. আব্দুল ওহাব ইত্তেফাককে জানান, ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা চাষ গবেষণা, সম্প্রসারণ ও জনপ্রিয়করণ নামের প্রকল্পটি কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রধান সংস্থা হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় বর্তমানে দুই ভাগে বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বরিশাল রহমতপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে সদর দপ্তর স্থাপন করে ২০১৭ সালে সূচিত এ প্রকল্প মেয়াদ ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত। তবে অর্থ ছাড় করা হয়েছে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে। প্রকল্প বাস্তবায়নের উপাদান ও কৌশল হিসাবে প্রকল্প এলাকায় বিদ্যমান জনসম্পদ, হাওর, বিল, নদী, জলাশয়, খাল, নিচু ও অতি নিচু ভূমি প্রভৃতি জলমগ্ন পতিত ভূমি, পানি, কচুরিপানা, টোপাপানা, দুলালীলতা, শ্যাওলা প্রভৃতি জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠুভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় সবজি ও মসলা ফসলসহ সার্বিক কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি এবং উপকারভোগী কৃষকের পুষ্টিগত অবস্থা ও উন্নতি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
