রাজধানীর তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মরদেহ। উত্তরার বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজের একদিন পর তার লাশ উদ্ধারের এই ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্য ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে রহস্যের পাশাপাশি তিনি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন কি না, তা নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের পটপরিবর্তন-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর দেশত্যাগের গোপন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ এবং বিমানবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুতির মতো সংবেদনশীল অধ্যায়গুলোর কারণেই তার এই মর্মান্তিক পরিণতি জনমনে গভীর কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে সময় তার দেশত্যাগের চূড়ান্ত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে একটি স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সেই ভিডিও ধারণ ও প্রচারের পেছনে বিমানবাহিনীর দুই কর্মকর্তা জড়িত ছিলেন, যাদের একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরি। প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর কথাও বলা হয়েছিল।
যদিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট কড়া প্রতিবাদ লিপি পাঠায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করা হয়, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রিফাত আশরাফী ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরিকে বিদেশি কোনো সংস্থার যোগসূত্রের কারণে নয়, বরং সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিমানবাহিনীর নিজস্ব আইন ও বিধিমালার যথাযথ প্রক্রিয়ায় অবসর দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই বিতর্ক নিয়ে সরাসরি মুখ খুলেছিলেন তাহসিফ সাউরি নিজেও। ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিকে স্রেফ ‘অভিযোগ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, তিনি যদি ভিডিওটি করেও থাকেন বা ছড়িয়েও থাকেন, তবে সেটির পেছনে কর্তৃপক্ষের কাছে কী প্রমাণ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, হয়তো সেই অভিযোগের কারণেই তাকে বিমানবাহিনী ছাড়তে হয়েছিল।
পারিবারিক সূত্র অনুযায়ী, শৃঙ্খলাজনিত কারণ দেখিয়ে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাহসিফ সাউরিকে বিমানবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয়। চাকরি হারানোর পর তিনি নিজেকে নতুনভাবে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও নেত্র নিউজসহ কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছিলেন। তবে প্রিয় পেশা হারানো এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে তার বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগের কারণে তিনি চরম মানসিক চাপে ভুগছিলেন। তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর বরাতে জানা যায়, বিমানবাহিনীর পাইলট হিসেবে ২০০ ঘণ্টা ওড়ার অভিজ্ঞতা থাকা সাউরির কাছে এটি ছিল তার স্বপ্নের পেশা। সেখান থেকে অপসারিত হওয়া এবং পরবর্তীতে সামাজিকভাবে হেনস্তার শিকার হওয়ায় তিনি মানসিকভাবে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছিলেন।
এই বহুমুখী আলোচনার মধ্যেই গত মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হন তাহসিফ সাউরি। নিহত কর্মকর্তার বাবা কে এম এনায়েতুল করিম জানান, মঙ্গলবার সারা দিন সাউরি তার মায়ের সঙ্গেই ছিলেন এবং পরিবারের সবার জন্য কেনাকাটাও করেছিলেন। তবে সন্ধ্যার পর এক বন্ধুস্থানীয় পরিচিত ছোট ভাইয়ের ডাকে উত্তরার বাসা থেকে বের হন তিনি। এরপর আর বাড়ি ফেরেননি। গভীর রাতে পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তার মোবাইল ফোন থেকে শেষ বার্তা আসে, যাতে লেখা ছিল ‘আম্মু আমি আসছি’। এর পর থেকেই তার ফোন বন্ধ হয়ে যায় এবং কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
পরদিন ২৮ অক্টোবর দুপুরে পরিবারের সদস্যরা থানায় যোগাযোগ করেন। পরবর্তীতে সন্ধ্যায় টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির মাধ্যমে তারা জানতে পারেন, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাট এলাকার কচুরিপানার মধ্য থেকে সাউরির ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারের সময় তার পরনে ছিল সাদা ট্রাউজার ও কালো জামা। উত্তরখান থানা পুলিশের পক্ষ থেকে বিষয়টি পরিবারকে নিশ্চিত করা হয়।
নিহতের বাবার দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তার ভাষ্যমতে, তুরাগ নদের রাজাবাড়ি ঘাট এলাকায় যাওয়ার পথ আটিপাড়া দিয়ে, যেখানে তার ছেলে জীবনে কখনো যায়নি। পরিচিত কারও ডাকে বের হয়ে এমন নির্জন এলাকায় গিয়ে তার ছেলের লাশ পাওয়ার ঘটনা কোনো সাধারণ বিষয় হতে পারে না। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে চিহ্নিত না করলেও তিনি এটিকে সুস্পষ্ট হত্যাকাণ্ড বলেই অভিযোগ করেছেন। অতীতে সরাসরি কোনো বড় হুমকির কথা না জানালেও ছেলে মাঝে মাঝে কিছুটা ‘শঙ্কিত’ বোধ করার কথা বলতেন বলে উল্লেখ করেন তার বাবা।
এদিকে তুরাগ নদ থেকে মরদেহ উদ্ধার হলেও মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিহতের সুরতহাল প্রতিবেদনে শরীরে কোনো দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না পাওয়ার কথা বলা হলেও, তার নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার বিষয়টি নথিবদ্ধ করা হয়েছে। বহুল আলোচিত পটপরিবর্তনের নানা ঘটনার সঙ্গে নাম জড়ানো একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার এমন রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনে আসলে কী ঘটেছে—তা জানতেই এখন দৃষ্টি সবার।
