পায়ে লিখে এইচএসসিতে কলির সাফল্য, স্বপ্ন ম্যাজিস্ট্রেট হওয়ার 

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:৩০

রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার নিভৃত পল্লীর বাবা হারা এতিম শারীরিক প্রতিবন্ধী কলি রানী (১৮)। জন্ম থেকেই তার দুই হাতের কবজি নেই। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার অদম্য মনোবল ও শিক্ষাজীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ডান পা দিয়ে লিখেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়েছেন। এবার ডান পা দিয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ ৩ দশমিক ৫০ পেয়েছেন তিনি। এখন তার স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া।

চলতি বছর কাউনিয়া কলেজ থেকে এইচএসসিতে অংশ নিয়ে এই সাফল্য অর্জন করেছে কলি।

জানা গেছে, কলি রানী উপজেলার হরিশ্বর গ্রামের প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের মেয়ে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ছোট বেলায় বাবাকে হারান তিনি। এরপর অভাব-অনটনের মধ্যেও মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে হাল ছাড়েননি তার মা রুপালী রানী। কলি রানীর এই সাফল্যে আনন্দিত ও খুশি পরিবার এবং এলাকাবাসী।

হরিশ্বর গ্রামের স্থানীয়রা জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধী কলি রানীর জীবনের পথটা সহজ ছিল না। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছেন তিনি। এরপর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। তার পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে বড় ভাই মন্টু রাম রায় তাকে স্কুলে ভর্তি করান।

কলি রানীর মা রুপালী রানী বলেন, ছোটবেলা থেকেই কলি রানী শারীরিক প্রতিবন্ধী। কিন্তু পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ দেখে তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও অভাব-অনটন কোনো কিছুই তার পড়াশোনার অদম্য ইচ্ছাকে দমাতে পারেনি।

কলি রানীর বড় ভাই মন্টু রাম রায় বলেন, কলি রানী স্বপ্ন দেখেন বিসিএস ক্যাডার হয়ে মানুষের সেবা করার। এ জন্য রাষ্ট্রের সহযোগিতা চান তার ছোট বোন। জন্মগতভাবে সে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। উচ্চতা প্রায় চার ফুট। শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় হাঁটাচলা করতেও তাকে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। অভাব-অনটনের সংসার হওয়ায় বসে না থেকে কখনো দিনমজুরি, আবার কখনো নিজের সামান্য জমিতে চাষাবাদ করে সংসার চালান তিনি। 

কলি রানী বলেন, ‘এখন আমার স্বপ্ন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিসিএস ক্যাডার হওয়া। তবে সেই স্বপ্ন পূরণে পরিবারের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষের সব বাধা-বিপত্তিকে পেছনে ফেলে আমি আমার ইচ্ছাশক্তি দিয়ে এ পর্যন্ত এসেছি। আমার ইচ্ছে, আমি বিসিএসে পাস করে ম্যাজিস্ট্রেট হতে চাই। আর আমাকে দেখে যেন প্রতিবন্ধীরা সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পারে।’

পড়াশোনার পাশাপাশি কলি রানীর রয়েছে বহুমুখী প্রতিভা। ডান পা দিয়েই অনায়াসে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার পরিচালনা করতে পারেন তিনি। শুধু তাই নয়, গানের প্রতিও রয়েছে তার বিশেষ আগ্রহ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করে এরই মধ্যে একাধিক পুরস্কার ও প্রশংসা অর্জন করেছেন তিনি।

উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. আনছার আলী বলেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে সব কিছু জয় করা যায়, তারই প্রমাণ দিয়েছেন কলি রানী। শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও শত প্রতিকূলতা জয় করে তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস করেছেন। তাঁর ইচ্ছে বিসিএস পাস করে একজন ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া। আমি তার সফলতা কামনা করি, যাতে তার মনের ইচ্ছা পূরণ হয়।

কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব রফিকুল ইসলাম জানান, বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধী পরীক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা থাকলেও কলি রানী সবার সঙ্গে বসেই পরীক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তার ইচ্ছা অনুযায়ী ৩০২ নম্বর কক্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে প্রতিটি পরীক্ষা সম্পন্ন করে তিনি সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

কাউনিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আজম বলেন, ‘কলি রানী পা দিয়ে লিখে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৩.৫০ পেয়েছে। তার এই সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। এর আগেও পা দিয়ে লিখে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) ও এসএসসি পরীক্ষায় সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে কলি রানী। এবার তার স্বপ্ন আরও বড়। উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিসিএস ক্যাডার হয়ে দেশ ও মানুষের সেবা করতে চায়। তার বিশ্বাস, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কখনো মানুষের স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হতে পারে না, যদি থাকে অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পরিশ্রম।’

ইত্তেফাক/এপি