দাউদকান্দি পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ে প্রায় অর্ধেক পদই শূন্য, নেই পর্যাপ্ত জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীও

আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৪:২৫

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায় পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে জনবল ও জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। অনুমোদিত ১৫৯টি পদের মধ্যে ৭২টিই শূন্য। অন্যদিকে, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় কনডম ছাড়া অন্যান্য পদ্ধতির সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে এসে অনেককে ফিরে যেতে হচ্ছে। মাঠপর্যায়ে কর্মী সংকটের কারণে দম্পতিদের পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে সচেতন করা ও পরামর্শ দেওয়ার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে একজন থাকার কথা থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাপ্তরিক কাজে অধিকাংশ সময় ঢাকার সদর দপ্তরে অবস্থান করেন। সহকারী মেডিকেল কল্যাণ কর্মকর্তা পদে দুজন থাকার কথা থাকলেও তাঁদের একজনকে হোমনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। মেডিকেল অফিসার (পরিবারকল্যাণ) পদে অনুমোদিত তিনটি পদের বিপরীতে কর্মরত কেউ নেই। ফার্মাসিস্টের তিনটি পদও শূন্য।

মাঠপর্যায়ের জনবল পরিস্থিতিও নাজুক। স্যাকমো পদে ছয়জন, এফডব্লিউভি ১১ জন, এফপিআই একজন, এফডব্লিউএ ২৭ জন, এমএলএস ও নিরাপত্তা প্রহরী ছয়জন, আয়া ১২ জন, দাইনার্স একজন ও ড্রাইভার একজনসহ মোট ৭২টি পদ শূন্য রয়েছে। ১৫৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ৮৭ জন।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতায় কনডম, খাবার বড়ি, ইনজেকশন, আইইউডি বা কপার-টি এবং ইমপ্ল্যান্টসহ বিভিন্ন জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সেবা দেওয়া হয়। এসব সামগ্রী বিনা মূল্যে সরবরাহের মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কিন্তু দাউদকান্দিতে এসব সামগ্রীর নিয়মিত সরবরাহ না থাকায় সেবাগ্রহীতারা প্রয়োজন অনুযায়ী পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানান, প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী না পেয়ে তাঁদের ফিরে যেতে হচ্ছে। বিষয়টি ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল হওয়ায় অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলতেও সংকোচ বোধ করেন।

সরেজমিনে গিয়ে স্টোরের দায়িত্বে থাকা অফিস সহকারী শাখাওয়াত হোসেন জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকটের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ পরিস্থিতি চলছে। মেরি স্টোপসের কাছ থেকে সীমিত পরিমাণে আইইউডি বা কপার-টি সংগ্রহ করে জরুরি প্রয়োজনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেবা দিতে হচ্ছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অধিকাংশ সময় রোগীরা আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে যান।’

অফিস সহকারী ফারুক হোসেন বলেন, ‘১৫৯টি পদের মধ্যে ৭২টিই শূন্য। ৮৭ জন জনবল নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে খুব কষ্ট হচ্ছে।’

এ বিষয়ে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুর রহমান মানিক বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পেয়ে থাকি। ২০২৪ সালে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন হয়নি। এ কারণে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আশা করছি, বর্তমান সরকার ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন প্রকল্প অনুমোদন দেবে। তখন আবার আগের মতো সামগ্রী সরবরাহ করা সম্ভব হবে।’

জনবল সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে গেছেন। ২০২৩ সালের পর থেকে নতুন করে আর কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ২০১৮ সাল থেকে পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা পদে নিয়োগ নিয়ে মামলা চলমান থাকায় এ পদে নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দাউদকান্দিতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও অসচেতন মানুষের জন্য বিনা মূল্যে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী ও পরামর্শ সহজলভ্য রাখা জরুরি। সেবার ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে পরিকল্পিত পরিবার গঠন ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইত্তেফাক/এএইচপি