রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির পর্যটন এলাকা সাজেক ও আশপাশে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জেএসএস (মূল) ও ইউপিডিএফ (মূল) দুই সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের পর অবরোধের গতকাল সোমবার পর্যন্ত ১৩ দিন অতিবাহিত হয়। খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য সংকটে বাসিন্দারা চরম মানবিক বিপর্যয়ের শিকার। অবরোধ শিথিল অবস্থঅয় গতকালও দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় থেকে রক্ষা পেতে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়ে এক দিনের জন্য অবরোধ শিথিল করা হয়। ঐ সময় পর্যন্ত সাজেক ও আশপাশের ব্যবসায়ী দোকানদারগণ খাদ্যসামগ্রীসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খাগড়াছড়ি বা চট্টগ্রাম শহর থেকে ক্রয় করার জন্য আসার সুযোগ দিয়েছে। গতকাল সোমবার থেকে সাজেকে আবারও অবরোধ শুরু হয়।
স্থানীয় প্রতিনিধিরা সাজেকের ব্যবসায়ী, দোকান মালিকসহ বিভিন্ন কমিটি ও পেশার লোকজনের সঙ্গে আলাপ করেন। তারা জেএসএস (মূল) ও ইউপিডিএফ (মূল) এ দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর দখল চাঁদাবাজি, গুম, খুন, ধর্ষণ, অপহরণসহ বর্বরোচিত ঘটনা বিভিন্ন ধরনের অপরাধের বিস্তারিত তথ্য জানান। এছাড়া তাদের ছত্রচ্ছায়ায় আরো কিছুসংখ্যক ছোটখাটো সশস্ত্র সংগঠন রয়েছে। মূলত দুইটি জেএসএস (মূল, সন্তু লারমা) ও ইউপিডিএফ (মূল, প্রসিত) তিনটি পার্বত্য জেলায় দখল, চাঁদাবাজি, খুন, গুম অপহরণসহ সব ধরনের অপরাধ করে আসছে। সর্বশেষ সাজেকসহ আশপাশের এলাকায় চাঁদাবাজিসহ ইউপিডিএফ (মূল)-এর কথিত সামরিক ঘাঁটি দখল ও চাঁদা আদায় একক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য জেএসএস (মূল) সঙ্গে উভয় পক্ষের সংঘর্ষ শুরু হয়। ১১ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর থেকে টানা অবরোধ চলে। শুধু এক দিনের গত রবিবার সকাল-সন্ধ্যা অবরোধ শিথিল করে। একসময় জেএসএস (মূল) সাজেকসহ আশপাশের এলাকা দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করেছিল। ইউপিডিএফ (মূল) এই এলাকা দখলে নিয়ে নেয়। ঐ সময় দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অনেক লোক হতাহত হয়েছে এবং অনেক বাসিন্দা এলাকাছাড়া হয়ে যান। ইউপিডিএফ (মূল) পূর্ণ দখলে নেওয়ার পর সাজেকসহ আশপাশে এলাকার বাসিন্দারা ফিরে আসে। তবে ব্যবসায়ী, হোটেল, মোটেল, দোকানপাটসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী সব পেশার মানুষ তাদের নির্ধারিত হারে চাঁদা দিয়ে আসছে। বছরে প্রায় ২ কোটি টাকা আদায় হয়। চাঁদা শুধু এ এলাকা থেকে ইউপিডিএফ (মূল) পেয়ে আসছে। এদিকে জেএসএস (মূল) উক্ত এলাকার পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। প্রায় উভয় পক্ষের মধ্যে প্রকাশ্যে বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। গত দুই মাস ধরে উভয় পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েক বার বন্দুকযুদ্ধ হয়। কয়েক মাস পূর্বে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) দলের সশস্ত্র কমান্ডার তরুণ চাকমার নেতৃত্বে একটি বড় অংশ জেএসএস (মূল, শন্তু লারমার) যোগ দেয়। তারা যৌথ শক্তি প্রয়োগ করে ইউপিডিএফ (মূল) এর নিয়ন্ত্রণ থেকে সাজেকসহ আশপাশের এলাকা দখল করে নেয়। ৭০ ভাগ এলাকা বর্তমান জেএসএস (মূল) নিয়ন্ত্রণে। খাগড়াছড়ি প্রতিটি এলাকার ইউপিডিএফ (প্রসিত)-এর একক আধিপত্য থাকলে বর্তমানে একের পর এক হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এই সংগঠনের একজন সশস্ত্র কর্মী (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) ইত্তেফাককে বলেন, সম্প্রতি মাটি রাঙ্গা সীমান্ত এলাকায় ইউপিডিএফ-এর অস্ত্রের চালান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আটক করে। প্রতিপক্ষের (জেএসএস) হামলায় ইউপিডিএফ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এদিকে ইউপিডিএফের প্রধান প্রসিত বিকাশ খীসা যে কোনো মূল্যে সাজেকের অবস্থান রক্ষা করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো চেষ্টা কাজে আসছে না। সাজেকসহ আশপাশে এলাকা ইউপিডিএফের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে উক্ত কর্মী জানান। জেএসএস (মূল, শন্তু লারমা)-এর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে সাজেকসহ আশপাশের এলাকা। জেএসএসকে (মূল) বিতারিত করার জন্য সাজেক পর্যটন এলাকা জিম্মি করে লাগাতার অবরোধ পালন করে ইউপিডিএফ। সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারী অ্যাসোসিয়েশন ব্যানারে মানবঢাল হিসেবে গ্রামের নিরীহ নারী-পুরুষকে অবরোধে ব্যবহার করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে উক্ত বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে। এই বিষয় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
এদিকে গত ১৬ অক্টোবর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কে স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ি সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভুঁইয়ার নেতৃত্বে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। শুধু খাগড়াছড়ি নয়, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি জেলাসহ সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে জেএসএস (মূল) ও ইউপিডিএফ (মূল) মূলত এই দুই সংগঠনেরনেতা কর্মীদের কাছে পাহাড়ি-বাঙালিরা জিম্মি। ব্যবসায়ী, ছোট দোকান থেকে শুরু করে সব পেশার লোক নির্ধারিত চাঁদা দেওয়া ছাড়া রক্ষা নেই। কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে তারা বিলাসবহুল জীবন যাপন করে আসছে। তাদের সন্তানরা বিদেশে পড়াশোনা করে। হেডম্যান ও সার্কেল প্রধান তাদেরও কোটি কোটি টাকা আয়। উক্ত দুই সংগঠন ছাড়া কুকিচিনসহ এক ডজনের অধিক ছোট সংগঠন রয়েছে। এদেরকে এলাকা ভিত্তিক নির্ধারিত চাঁদা দিতে হয়। পার্বত্য অঞ্চলে গহিন অঞ্চলে বিদ্যুত্ ছিল না রাস্তাঘাট ছিল। এখন প্রায় সব হয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক সহযোগিতার কারণে এত উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে। জেএসএস ও ইউপিডিএফ চাঁদাবাজি, গুম, খুন, অপহরণ, ধর্ষণ ও নানা নির্যাতনে পাহাড়ি বাঙালিরা অতিষ্ঠ। এর থেকে তারা বাঁচতে চায়। চাঁদাবাজ, খুনি ও বিভিন্ন অপরাধী নির্মূলে সরকার কঠোর হস্তে দমন করার জন্য তিন পার্বত্য জেলার পাহাড়ি ও বাঙালিরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
