বন্ডের সুতা-কাপড় খোলাবাজারে

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০১৯, ২১:৫৫

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে তৈরি পোশাক শিল্পখাত থেকে। কিন্তু এ খাতের ব্যাপক কাঁচামাল আমদানির কারণে রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। আবার অসাধু রপ্তানিকারকরা অনেক সময়  তুলা, সুতা, কাপড় এবং অন্যান্য এক্সেসরিজ বন্ড সুবিধার আওতায় এনে সেগুলো খোলাবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে। ওভেন খাতে যে পরিমাণ রপ্তানি হয় তার ৬০ ভাগ কাপড় আমদানিনির্ভর। অপরদিকে, নিটওয়্যার খাতে বিগত বছরগুলোতে কাঁচামাল উত্পাদনের পরিমাণ বাড়লেও প্রচুর সুতা আমদানি করতে হচ্ছে। আর এর সুযোগ নিচ্ছেন ঐ অসাধু উদ্যোক্তারা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, চলতি বছরের (২০১৯) প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) স্থানীয় মিলগুলোতে উত্পাদন করা মোট পাঁচ লাখ ছয় হাজার ২৪২ টন সুতা বিদেশে রপ্তানি হয়েছে। আর উদ্যোক্তারা আমদানি করেছেন মোট ছয় লাখ দুই হাজার ৪৩২ টন সুতা। আমদানি করা সুতার সবটুকু বন্ডের মাধ্যমে আমদানি করা হলেও তার পুরোটা রপ্তানিতে ব্যবহার করা হয়নি। অধিকাংশ সুতা আমদানিকারকরা খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। এর ফলে স্থানীয় কারখানাগুলো এক অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়েছে।

স্থানীয় উদ্যোক্তারা জানান, শুধু সুতাই নয়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে যে পরিমাণ কাপড়ের প্রয়োজন হয় তার সিংহভাগ আমদানি করতে হয়। এ কাপড়গুলোও আসে বন্ডের মাধ্যমে। আর এ খাতে চলছে ব্যাপক অনিয়ম। সুতা এবং কাপড় এনে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া নিয়মিত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। মাঝেমধ্যে এ ধরনের দুই-একটি ঘটনা উদঘাটিত হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘটনার কারিগররা থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাজধানীর ইসলামপুরে বন্ডের কাপড় এবং তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল বিক্রি হচ্ছে অহরহ। যেসব এলাকায় তাঁতশিল্প রয়েছে সেগুলোতেও বন্ডের সুতা বিক্রি হচ্ছে দেদারছে।

এনবিআর এর তথ্যমতে, ২০১৮ সালে উদ্যোক্তরা মোট ২৮ কোটি আট লাখ কেজি কাপড় আমদানি করেছে।

বস্ত্রখাতের উদ্যোক্তারা জানান, নামসর্বস্ব অনেক কারখানা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করছে বেশি। রপ্তানির চেয়ে তাদের আগ্রহ বেশি থাকে খোলাবাজারে বন্ডের পণ্য বিক্রি করার দিকে। উদাহরণ হিসেবে একজন উদ্যোক্তা বলেন, কোনো কারখানার যদি দুই টন সুতা লাগে তিনি নিয়ে আসেন পাঁচ টন। বাকি তিন টন তিনি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। শুল্কমুক্তভাবে এসব সুতা আমদানির ফলে বিক্রিমূল্যও কম পড়ে। এতে স্থানীয় মিলগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। আবার অনেক সময় কারখানাগুলো বন্ডের আওতায় কাপড় বা সুতা এনে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার পর মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বা বিকেএমইএ থেকে ভুয়া ইউডি (ইউজার্স ডিক্লারেশন) নিয়ে নেয়। এতে বন্ড কর্তৃপক্ষ ঐ জালিয়াতদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয় না। টেক্সটাইল শিল্প মালিকদের পক্ষ থেকে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে বার বার পদক্ষেপ নিতে বলা হলেও কার্যকর উদ্যোগ এখনও শুরু করা যায়নি। তবে সাম্প্রতিক অতীতে বন্ড জালিয়াতচক্র তাদের কাজের গতি বাড়ানোর জন্য সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস স্থাপনের অনুমতি চেয়েছিল। তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে জোরালো লবিং করা হলেও টেক্সটাইল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএ’র প্রবল বিরোধিতার কারণে সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, আমরা বন্ড সুবিধার বিরোধী নই। আর প্রকৃত ব্যবসায়ীরা কোনোদিন বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে না। কিন্তু পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার হচ্ছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে এনবিআর এর কর্মকর্তারা আন্তরিক, কিন্তু তাদের জনবলের অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশের রপ্তানি অনেক বেড়েছে। এর সাথে তাল মিলিয়ে বন্ড অফিসের লোকবল বাড়েনি। এনফোর্সমেন্ট খাতে জনবল বাড়ালে প্রচুর লিকেজের ঘটনা ধরা পড়বে।