পুরাকীর্তি

রানি ময়নামতি প্রাসাদ

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০২

কুমিল্লার ঐতিহাসিক লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের সর্ব উত্তর প্রান্তে বিচ্ছিন্ন টিলায় রানি ময়নামতি প্রাসাদের অবস্থান। বিগত শতাব্দের ষাটের দশকে সর্বপ্রথম খনন কাজ হয় এখানে। এরপর চার দফা ১৯৮৮, ১৯৯৬, ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ সালে আরো খনন কাজ হয়। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দে এই পুরাস্থাপনার ধ্বংসাবশেষ থেকে চারটি বসতি আমলের অস্তিত্ব আবিষ্কৃৃত হয়েছে। ২০১৬-১৭ ও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দু’দফা খননের সময় এখানে আবিষ্কৃৃত হয়েছে মাটির ভাঙা পাত্র ও লোহার পেরেকসহ   বিভিন্ন তৈষজপত্রের টুকরো। এছাড়াও সপ্তম-অষ্টম শতাব্দের একটি গোপন পথ। কিন্তু খননকৃত এলাকাটি সংরক্ষণ ছাড়া বেশ কিছুদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় মাটি ধসে পড়াসহ নষ্ট হচ্ছে আবিষ্কৃৃত অবকাঠামোগুলো।

লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের সর্ব উত্তরের জনপদ ময়নামতি। এই এলাকাটি প্রশাসনিকভাবে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি ইউনিয়নে অবস্থিত। কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের উত্তর পাশে বিচ্ছিন্ন একটি টিলায় প্রাসাদ এলাকাটির অবস্থান। এখানে খননের ফলে আবিষ্কৃৃত ক্রুশাকৃতি পুরাস্থাপনার সঙ্গে শালবন বিহারের প্রথম আমলের কেন্দ্রীয় মন্দিরের সাদৃশ্য রয়েছে। চারটি নির্মাণ যুগের নিদর্শন আবিষ্কৃৃত হওয়া এই পুরাস্থাপনার উত্তর-দক্ষিণে ১৫৫.৪৫ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৫২.৪০ মিটার প্রাচীর ঘেরা ছিল, যা এখন শুধু সীমানা চিহ্ন বহন করে। এখানে বিগত সময়ে আবিষ্কৃৃত পুরাবস্তুগুলোর মধ্যে অন্যতম পোড়ামাটির চিত্রফলক। কয়েকটি ফলকের দৃশ্যে রয়েছে আড্ডায় একাধিক পুরুষ, শিকারসহ নকুল জাতীয় একটি প্রাণী, নরসিংহ, বামন, কচ্ছপ, মহিষ, রাজহাঁস, রূপান্বিত ময়ূর, হামাগুঁড়ি দিয়ে শিশুর সঙ্গে খেলায় মত্ত মা, কিষাণের হালকর্ষণ, দুটি চতুষ্পদ প্রাণীর মৈথুন্য, কিন্নর, লোহার পেরেক, ভাঙা তৈষজপত্র ইত্যাদি। এছাড়াও আবিষ্কৃৃত কয়েকটি ইটে পিরামিড ও পদ্মপাপড়ি রূপচিহ্ন আছে। রানি ময়নামতি প্রাসাদ এলাকায় মাঝামাঝি অংশে আবিষ্কৃত ঢিবির ওপর উনিশ শতকের গোড়ার দিকে আগরতলার তত্কালীন মহারাজা কুমার কিশোর মানিক্য বাহাদুর তাঁর স্ত্রী মনমোহিনীর জন্য একটি আধুনিক বাগানবাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। সেই থেকে এলাকাটি ‘রানির বাংলো’ নামে পরিচিতি পায়।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির ফলে কুমিল্লা তত্কালীন পাকিস্তানের অংশে পড়ে।  এরপর থেকেই বলতে গেলে রানি ময়নামতি প্রাসাদ এলাকাটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খননের সময় রানি ময়নামতি প্রাসাদের দক্ষিণ দিকের সীমানা প্রাচীরের কিছু কাজ করা হয়েছিল। তবে প্রায় পুরো অংশ এখনো অরক্ষিত রয়ে গেছে। ফলে অবাধে মানুষজনদের চলাচল রয়েছে। দিনের বেলায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দুজন অস্থায়ী শ্রমিক দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও রাতের বেলা একেবারেই অরক্ষিত থাকে। অনেকেই রাতে এখানে মাদক সেবন করে। চারদিকে কোনো বৈদ্যুতিক বাতি না থাকায় অন্ধকার থাকে পুরো এলাকাটি। এদিকে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে খননের পর ঐ এলাকাটিও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। এতে খননের ফলে আবিষ্কৃত অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে খননকৃত স্থানগুলোর নিরাপত্তা বিধানে দেওয়া হয়েছে বরই গাছের কাটাযুক্ত কয়েকটি ডাল।