বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা

অর্থনৈতিক দুর্বলতায় কমছে ঋণের চাহিদা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:০০

দেশের বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি কমে গেছে। বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসার পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া থেকে বিরত থাকছেন তারা। এতে ব্যাংকঋণের চাহিদাও কমছে। পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে। সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা গত তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে টানা সাত মাস বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। মার্চে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলে ৪ দশমিক ৭৫ এবং মে মাসে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে উঠলেও জুনে তা কমে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ হয়। জুলাইয়ে ৪ দশমিক ৬২ এবং আগস্টে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে পৌঁছানোর পর সেপ্টেম্বরে আবার কমে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসে।

ঋণের চাহিদা কমার চিত্র পাওয়া যায় ব্যাংক খাতের আমানত ও ঋণের তুলনাতেও। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে ব্যাংক খাতে আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে আমানত বেড়েছে ১২ শতাংশ। অথচ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অর্থাত্ ব্যাংকে আমানত বাড়লেও সেই অর্থের বড় অংশ বেসরকারি বিনিয়োগে ঋণ হিসেবে যাচ্ছে না।

ঋণপ্রবাহ বাড়াতে গত ৩০ জুলাই নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে সুদহার কমানোর পরও ঋণের চাহিদা বাড়েনি। সেপ্টেম্বরে দেশের মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এর বিপরীতে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসায় অর্থনীতিতে ঋণের প্রকৃত সম্প্রসারণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু ঋণের সুদ কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কর ও ভ্যাট ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা না এলে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ তৈরি হবে না।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনার অনুকূল পরিবেশ নেই। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে করছেন না। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে চার শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকেও ২০৩০ সালের আগে বিদ্যুত্ পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ভ্যাট-করসংক্রান্ত জটিলতা ব্যবসার ব্যয় বাড়াচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া কঠিন। 

অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণেও সতর্কতা বেড়েছে। খেলাপি ঋণের চাপ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় নতুন ঋণ অনুমোদনে ঝুঁকি বিবেচনা করছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি।

২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধিতে নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এ সময়ে কয়েকটি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা বন্ধ হয়েছে। চালু থাকা অনেক কারখানায় উত্পাদনও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমেছে।

ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, হঠাত্ করেই এমন হয়েছে বিষয়টি এমন নয়। এই সমস্যাগুলো বিগত কয়েক বছর থেকেই চলছে। এখন নতুন করে যেটা হচ্ছে—একটি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সরকার এসেছে। ইতিমধ্যেই অনেক ব্যবসায়ী ঋণখেলাপি। এখন সরকারকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সরকার চেষ্টা করছে কীভাবে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়। সম্প্রতি সরকার বিভিন্ন দেশ সফর করছেন। এটি সামনে আরো বাড়বে। তবে সরকারকে অবশ্যই সুদহার নিয়ে ভাবতে হবে। এত উচ্চ সুদ ও ভ্যাট-ট্যাক্সে ব্যবসায়ীরা সুবিধা করতে পারছে না।

ইত্তেফাক/এএম